- ভিসি নিয়োগ হচ্ছে দলীয় প্রভাবে
- প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রশাসন নিরপেক্ষতা ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি, প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষ ও ইউজিসির চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগের অভিযোগ নতুন নয়। তবে ধারণা করা হয়েছিল, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে হয়তো এ ধারার পরিবর্তন হবে। তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল নিয়ে আবারো আলোচনা শুরু হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের প্রশাসন থেকে ভিসি, প্রোভিসি থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন বা তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়াজ আহমদ খান অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। তার জায়গায় নতুন ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজও অব্যাহতি চান। এরপর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন বসানো হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, এসব নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বদলে পুরনো কাঠামো হাজির হতে পারে।
গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। এর আগে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপত্রও কিনেছিলেন তিনি। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় বিএনপির প্রচার কার্যক্রমেও দেখা যায় তাকে।
একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ঢাবির প্রোভিসি (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আব্দুস সালাম। তিনি সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। আর প্রোভিসি (প্রশাসন) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের নিয়োগ দেখা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো: ফরিদুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। তিনি সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর সক্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি এই দলের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়াও জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আরো ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়েছে। এতে আবারো রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় বিবেচনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে- এ প্রশ্ন এখন অনেকের। শিক্ষাবিদদের মতে, ক্ষমতায় থাকা দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে চেয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার জায়গা নয়, এটি রাজনৈতিক মতাদর্শ তৈরিরও বড় ক্ষেত্র। ফলে যে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে বসাতে আগ্রহী হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব নিয়োগের মাধ্যমে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণ, শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্ররাজনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ কারণে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেকসময় অ্যাকাডেমিক দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছেন, দলীয় রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তখন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন বেশি সুবিধা পায়। এতে ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদ তৈরি হয়। বিরোধী মতের শিক্ষার্থীরা নানা চাপের মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী নয়া দিগন্তকে জানান, প্রশাসনের আশীর্বাদ পেলে ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করে। হল দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ভিন্নমত দমন এবং সাংগঠনিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জন পিছিয়ে যায়। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলোতে এমন ব্যক্তিদের দরকার যারা গবেষণা, শিক্ষা ও অ্যাকাডেমিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষক রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় থাকেন। এতে শিক্ষকের নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব নিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হয়েছিল, এখনো একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করেন, সরকার বদলালেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ সংস্কৃতি বদলায়নি।
শিক্ষক রাজনীতিতে জড়িত না থাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলছেন, দলীয় পরিচয় থাকতেই পারে, তবে প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে প্রধান বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে পরিণত হবে।
তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র বানানো হলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকরা যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভক্তি বাড়ে।
এ দিকে গত ১২ মে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এটির মূল আরো গভীরে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেছেন, যতদিন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের প্রধান হিসেবে ভিসি/প্রোভিসি থাকবে আর ভিসি/প্রোভিসি নিয়োগে রাজনীতি থাকবে ততদিন শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতি থামানো সম্ভব নয়।
শিক্ষাবিদ ড. মনসুর আহমেদ জানান, ‘শুধু একজন ব্যক্তি ভালো শিক্ষক বা গবেষক হলেই হবে না, তাকে কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজনৈতিক পরিচয় নিয়োগের মূল মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার চরিত্র হারাবে। রাজনৈতিক প্রভাব কমানো না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা কঠিন হবে।’
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে যোগ্যদের সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রয়োজন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের মত, ‘এই মন্ত্রণালয় বা কমিশনের অধীনে একটি সার্চ কমিটি ভিসি নিয়োগে কাজ করবে। কমিটিতে দেশী ও বিদেশী সদস্য থাকবেন। সেখান থেকে সৎ ও যোগ্যদের ভিসি হিসেবে বেছে নেয়া হবে।’
তার মতে, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে কখনো যোগ্য ভিসি পাওয়া যাবে না। কারণ, নির্বাচন করতে গেলে নানা সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের ভোটে জিতে আসতে হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কম্প্রোমাইজ করতে হবে।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জানান, ‘বাংলাদেশে অতীতে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে। সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভিসি নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়েছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেছেন, ‘রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের ডিসকোয়ালিফিকেশন?’
প্রত্যেকটি ভিসি নিয়োগের আগে তাদের যোগ্যতা, সাইটেশন, কোটেশন, গুগল সার্চ, পিএইচডি, পোস্ট ডক এবং এমফিল ডিগ্রি খতিয়ে দেখা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যাদের পারফরম্যান্স ভালো, তাদেরই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বজনপ্রীতি বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা ও তাদের যোগ্যতা প্রয়োজনে সবার সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন।



