যুক্তরাষ্ট্রে ৯ মাসে ৮০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভিসা বাতিল দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশীরাও

Printed Edition

মঈন উদ্দিন খান নিউ ইয়র্ক থেকে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ৯ মাসে প্রায় ৮০ হাজার নন-ইমিগ্র্যান্টের (অভিবাসনপ্রত্যাশী) ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান এ কঠোর পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির ইতিহাসে এত স্বল্পসময়ে এত বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের নজির বিরল। অবৈধ অভিবাসন রোধে ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বহু বাংলাদেশী। যারা এখনো কোনো বৈধ কাগজপত্র পাননি, তারা খুব সাবধানে রয়েছেন। কোনো অপরাধে যুক্ত না থাকলেও তাদের দিন কাটছে হতাশায়।

শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গত ৯ মাসে যে ৮০ হাজার মানুষের ভিসা বাতিল করা হয়েছে, তাদের সবাই অবৈধ অভিবাসী নন; অনেকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা খণ্ডকালীন কর্মী বা শিক্ষার্থীও ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অবৈধ অভিবাসীমুক্ত’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং ক্ষমতায় এসে সে লক্ষ্যে একাধিক নির্বাহী আদেশে সই করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, বাতিল হওয়া ভিসাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজারটি বাতিল হয়েছে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে, ১২ হাজারটি হামলা বা সহিংসতার অভিযোগে এবং ৮ হাজারটি চুরির মামলায় অভিযুক্ত থাকার কারণে।

একজন মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, যাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেকই এ তিন ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত। অন্য দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরো জানান, গত আগস্ট মাসে একক মাসেই প্রায় ৬ হাজার বিদেশী শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা দেশে অবস্থান করেছেন, আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে ‘সন্ত্রাসবাদে সমর্থন’ দিয়েছেন। গত মে মাসে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, আমরা ইতোমধ্যেই হাজার হাজার নন-ইমিগ্র্যান্টের ভিসা বাতিল করেছি এবং এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। যাদের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাদের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে।

নির্বাহী আদেশ জারির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিযান শুরু হয়। ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন শহরে কাস্টমস পুলিশ, ফেডারেল আধাসামরিক বাহিনী এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যৌথভাবে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে হাজার হাজার নথিবিহীন অভিবাসীকে আটক করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দেশটির ইতিহাসে এত স্বল্পসময়ে এত বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের নজির বিরল।

বাংলাদেশী পলাশ সরকার আটক : যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) হাতে প্রবাসী বাংলাদেশী পলাশ সরকার আটক হয়েছেন। পেনসিলভেনিয়ার একটি আদালতে হাজিরা দিতে এসে তিনি আইসের হাতে আটক হন বলে জানা গেছে। আটক হওয়ার কারণে পলাশের ইন্দোনেশিয়ান স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার বিপাকে পড়েছেন।

এ দিকে আইসের হাতে আটক বাংলাদেশীর পরিবারের সহায়তায় একটি ‘গো-ফান্ড’ তহবিল খোলা হয়েছে। আর্থিক সঙ্কটে পড়ে এই তহবিলটি খুলেছেন পলাশ সরকারের স্ত্রী নিজেই।

জানা যায়, পলাশ সরকার চলতি বছরের ৩ জুলাই পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরে আইস কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন। হঠাৎ আটক হওয়ার পর থেকেই তার পরিবার চরম দুরবস্থায় পড়ে।

পলাশ সরকারের বাড়ি বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। ২০২১ সালে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জন্য আবেদন করেন। তবে নির্ধারিত ইন্টারভিউয়ের দিনই আইস কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়।

পলাশের স্ত্রী একজন ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক। তাদের পাঁচ বছর বয়সী এক পুত্রসন্তান রয়েছে। বর্তমানে তিনি চরম অর্থকষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমকে পলাশের স্ত্রী জানিয়েছেন, আটক হওয়ার পর থেকে পলাশকে পর্যায়ক্রমে নিউ ইয়র্ক, নিউজার্সি, লুইজিয়ানা হয়ে বর্তমানে টেক্সাসে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৭০ জনের সাথে একঘরে তিনি আছেন। চার মাস পার হয়ে গেছে। আইনি ফি ও দৈনন্দিন খরচ চালাতে গিয়ে আমরা আমাদের সব সঞ্চয় হারিয়েছি- বলেন তিনি।

স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটি এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বহু অভিবাসী পরিবারের অনিশ্চিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ আরো কঠোর হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ অভিবাসীকে ডিপোর্ট করা হয়েছে এবং ১৬ লাখ অভিবাসী স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেছেন।

শুধু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম মাসেই ৩৭ হাজার ৬৬০ জন অভিবাসীকে দেশান্তরিত করা হয়। বর্তমানে আইসের হেফাজতে রয়েছেন ৫৯ হাজার ২০৭ জন অভিবাসী। এসব ঘটনার ফলে দক্ষিণ এশীয় ও লাতিনো সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।