সংসদে সংস্কার নিয়ে তুমুল বিতর্ক

সংবিধান সংশোধনে কমিটির প্রস্তাব সরকারের, ভিন্নমত বিরোধীদের

Printed Edition
সংসদে সংস্কার নিয়ে তুমুল বিতর্ক
সংসদে সংস্কার নিয়ে তুমুল বিতর্ক

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ ঘিরে অনুষ্ঠিত সাধারণ আলোচনা পরিণত হয়েছে তুমুল বিতর্কে। সংবিধান সংশোধন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসÑ সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি একে অপরের সমালোচনায় সরব হয়েছে।

সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। সংসদে আসনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এ কমিটির গঠনের প্রস্তাব দেন তারা। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আজকের পুরো আলোচনার বিষয় সংস্কারের ওপর, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর, পরিষদের সভা আহ্বানের ওপর। ভালো হতো যদি এ রকম প্রস্তাব দিতেন যে, এ সংস্কার নিয়ে যা আলোচনা হলো তা নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি করা হবে। তিনি বলেন, কোনো কমিটি গঠন করতে হলে তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে হতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব (বিধি-৬২)-এর ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তারা। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’-এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

গতকাল মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান। এ আলোচনায় অংশ নেন সরকারদলীয় সদস্য আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সাইফুল আলম মিলন, নাজিবুর রহমান ও নূরুল ইসলাম বুলবুল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মো: আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সংসদের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ। পরে ওই প্রস্তাবকে সমর্থন জানান আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্যের পরে বক্তব?্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছেন সংবিধান সংশোধনের জন্য; কিন্তু আজকের পুরো আলোচনাই হচ্ছে সংস্কারের ওপর, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ওপর, পরিষদের সভা আহবানের ওপর। ভালো হতো যদি তিনি এ রকম প্রস্তাব দিতেন যে, এ সংস্কার নিয়ে যা আলোচনা হলো তা নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি করি। আমরা এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি। আমরা সঙ্কট তৈরির জন্য এখানে আসি নাই। দেশের মানুষের সঙ্কট নিরসনের জন্য এখানে এসেছি।

এরপর বক্তব?্য দেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে আইন মন্ত্রী স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনি একটি কমিটি গঠন করে দিন। এ সংসদ একটি কমিটি গঠন করুক, সেখানে আমরা সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জুলাই সনদের পথ ধরে এমন একটি সংশোধনী আনব, যা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।’

তিনি বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, বিরোধী দলের নেতাও তা ইনডিরেক্টলি গ্রহণ করে বলেছেন- সদস্যসংখ্যা ৫০-৫০ হলে ভালো হয়। মাননীয় স্পিকার, বিচার মানেই তালগাছটা আমার এটা তো হতে পারে না! সংসদে ২১৯ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ, আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ এটা পৃথিবীর কোন জায়গায় আছে? এটা কি বৈষম্য না? এটা কোন আইনে আছে?

আইন মন্ত্রীর বক্তবে?্যর পর স্পিকার আজ বুধবার পর্যন্ত সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতাকে বলতে শোনা যায়, মাননীয় আইন মন্ত্রী আমাকে মিসড্ কোড করেছেন। পরে রাতে সংবাদ সম্মেলনেও তিনি একই কথা বলেন।

সংসদ ও সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দেশ এবং জাতির জন্য সংবিধান এবং এ সংসদ। আমরা কে সরকারি বেঞ্চে আর কে বিরোধী বেঞ্চে, এটা কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যারা একসময় ওখানে বসতেন, আজ তারা কোথাও নেই। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি।

সরকারকে গঠনমূলক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রথম দিনই বলেছিলাম, আমরা একটি গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। বিরোধিতার খাতিরে কোনো বিরোধিতা নয়; বরং যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা করব এবং জাতির অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে বিরোধিতা করব।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জনগণের বৃহত্তর রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান ডা: শফিকুর রহমান। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহঙ্কার এড়িয়ে সংসদে যেকোনো ইস্যুতে একটি সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছাতে তিনি স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দেয়া বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তার শর্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা শুধু এক লাইনে চলতে থাকলাম, এটার সমাধান কিভাবে হবে তা আমরা সবাই বুঝি। আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হলো, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে, সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে এ কমিটি গঠন করতে হবে।

এর আগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)’ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, যে নোটিশটি বিরোধীদলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, এ পরিষদের অধিবেশন কেন রাষ্ট্রপতি আহ্বান করলেন না? এ আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল।

রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির ক্ষমতা রইল না। তারপরও রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করলেন কিভাবে? যেই আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সে আদেশ লিগ্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ সূচনা থেকেই অবৈধ। এ আদেশটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ না হওয়ার কারণে সংসদের প্রথম দিনে উপস্থাপন করা হয়নি।

গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সাথে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সাথে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না। তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কোনো আইনি বিধান ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সর্বশেষ, রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই। তাই আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এ মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।

আলোচনায় অংশ নিয়ে যারা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান তাদের কড়া সমালোচনা করেন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এ সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?’ তিনি বলেন, জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভুলিউশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেন, এটা আসলে হয় না।

জনগণের প্রয়োজনে এ সংবিধান যেকোনো সময় সংশোধন বা সংস্কার করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সংবিধান তো কোনো কুরআনের বাণী নয়, কোনো অহি নয়। জনগণের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। কাজেই জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করায় কোনোই অসুবিধা থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমরা যদি আবার সুযোগ পাই, এ সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দেবো। উনার কথা কি একেবারেই অমূলক ছিল? সংবিধানের কথা বলে বিরোধী দলের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা আমাদের স্পষ্ট মনে আছে।

তিনি আরো বলেন, সরকারে যারাই থাকে, তারা সবকিছু দলীয়করণ করার চেষ্টা করে। আমরা আশা করবো, বর্তমান সরকার দলীয়করণ করবে না। যদি দলীয়করণ না-ই করেন, তাহলে সংস্কারে আপনাদের এত ভয় কিসের? আমরা সবাই মিলে সংস্কার করে দেশটাকে সুস্থ রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম না হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার তা ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। ওই সময় কোন সংবিধানের বলে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছিল, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ৬ তারিখে সংসদ ভেঙে দেয়ারও কোনো সাংবিধানিক ফর্মুলা ছিল না। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জনগণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে।

আইন মন্ত্রীর সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, আইন মন্ত্রী সংবিধান সংস্কার আদেশের এক্সপার্ট প্যানেলের সদস্য ছিলেন। তিনি নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন কিভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। আর আজ আইন মন্ত্রী হয়ে তিনি সবকিছু বেমালুম ভুলে গেছেন! তারা হবস, লক আর রুশো পড়ার কথা বলেন, কিন্তু নৈতিকতার পাঠ ভুলে গেছেন। সরকারি দলের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এনসিপি সদস্যসচিব বলেন, অধ্যাদেশ নিয়ে টালবাহানা করলে জনগণ আপনাদের ছাড় দেবে না। সরকার দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এখানে আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতার বিষয় নেই, এটা সদিচ্ছার বিষয়। আপনারা সদিচ্ছা দেখালে এবং গণভোটের রায় মেনে নিলে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না। গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করা হোক, বা না হোক গণভোটকে অবৈধ করার কোনো সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বক্তব্যের শুরুতে এক রাজা ও তার নির্বোধ উজিরের গল্প তুলে ধরে এ সংসদ সদস্য বলেন, উজিরকে কাজের তালিকা করে দিয়েছিলেন রাজা। একবার ঘোড়ায় ওঠার সময় রাজার পা রেকাবে আটকে গেলে তিনি উজিরকে সাহায্য করতে বলেন। কিন্তু উজির তার কাজের তালিকায় এ উদ্ধারের কথা লেখা না থাকায় রাজাকে সাহায্য করেননি। বর্তমান সংসদের অবস্থাও ওই উজিরের মতো। আমরা লাইনে দাড়ি-কমা, সেমিকোলন খুঁজছি, অথচ মূল কাজ ফেলে রেখেছি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নেসেসিটি নোজ নো ল’, আমরা এ বাক্যটিকে আজ সংবিধানের ধারার মধ্যে আটকে ফেলেছি।

যারা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান, তাদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বলেছিলেন, জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এ সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। যারা আজ সংসদে সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে টেবিল চাপড়াচ্ছেন, তারা কি এর মাধ্যমে বেগম জিয়াকেই অপমান করলেন না? তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, উনি সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চায় তাদের স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে অ্যালাইন (চিহ্নিত) করলেন। আর ট্রেজারি বেঞ্চের মাননীয় মন্ত্রীরা সেটাতে টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন দিলেন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন লড়াই করা বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এ সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চের অনেক মন্ত্রী সারা জীবন বেগম জিয়ার সাথে রাজনীতি করেছেন। আজ যখন তারা সংবিধান ছুড়ে ফেলার বিপক্ষে হাততালি দিচ্ছেন, তখন কি তারা বেগম জিয়াকে অপমান করছেন না? এটা তারা ভেবে দেখবেন।

প্রস্তাব উত্থাপনকালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে কোনো রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশ পরম্পরায় শাসনেরও ব্যবস্থা থাকে না। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও বারবার জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে। দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোন মূল্যায়ন ছিল না। সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচ দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়ে তা ব চালানো হয়েছে। অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনো আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাে র শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি। এ ছাড়া রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে। এ জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নয়; কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুরসহ সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এ আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায় বিচারের ওপরে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে। এ আকাক্সক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।