গাজায় শিগগিরই আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের আশা ট্রাম্পের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ১০০টির বেশি ত্রাণ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান ইসরাইলের
  • ৫ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিলো ইসরাইল
  • দক্ষিণ গাজা থেকে হামাস যোদ্ধাদের সরিয়ে নিতে আলোচনা

ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে এক অনুষ্ঠানে মধ্য এশিয়ার এক নেতার সাথে বৈঠকের পর তিনি এ তথ্য জানান। খবর আলজাজিরা, টিআরটি ওর্য়াল্ড ও রয়টার্সের।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, গাজার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। আমরা শিগগিরই সেখানে আন্তর্জাতিক বাহিনী দেখতে পাব। গাজা ইস্যু নিয়ে এখন আর বেশি কিছু শোনা যাচ্ছে না। যদি হামাসের সাথে কোনো জটিলতা দেখা দেয়, বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো ইতোমধ্যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা নিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ দুই বছর মেয়াদি একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসন সংস্থা ও স্থিতিশীলতা বাহিনীর জন্য ম্যান্ডেট অনুমোদনের আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। এমন সময়েই ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে। আন্তর্জাতিক বাহিনীর দায়িত্ব থাকবে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেয়া।

এই বাহিনীতে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সৈন্যরা অংশ নেবেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসর, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ক গাজা সংক্রান্ত যে খসড়া প্রস্তাব দেখেছে, তাতে প্রায় ২০ হাজার সৈন্যের একটি স্থিতিশীল বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বাহিনীকে তার ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দেয়া হবে অর্থাৎ, প্রয়োজনে বল প্রয়োগেরও অধিকার থাকবে।

ত্রাণ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান : এ দিকে জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইল গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের ১০৭টি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে, যার ফলে জরুরি মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, “আমাদের অংশীদাররা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ কম্বল, শীতের পোশাক, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার সরঞ্জামসহ ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের ১০৭টি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।”

তিনি আরো বলেন, “এই প্রত্যাখ্যাত অনুরোধগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে ৩৩০টির বেশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও থেকে। এসবের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অনুরোধ এই যুক্তিতে বাতিল করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে গাজায় ত্রাণসামগ্রী আনার অনুমতি দেয়া হয়নি।”

৫ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি : ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকা থেকে পাঁচজন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে, যারা সেনা পরিচালিত কারাগারে মাসের পর মাস বন্দী ছিলেন। গাজার মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার মুক্তিপ্রাপ্ত পাঁচজন দেইর আল-বালাহ শহরের আল-আকসা শহীদ হাসপাতাল পৌঁছেছেন। তবে তাদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

মুক্তিপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই অসুস্থ ছিলেন এবং অনেকেই ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে নারী ও শিশুসহ ১০ হাজাররের বেশি ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

হামাসের সুড়ঙ্গ ধ্বংসে নির্দেশ : গাজায় আইডিএফের পিছু হটার পর যেসব এলাকায় হামাসের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ রয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস কর দিতে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। তিনি এই নির্দেশকে ইসরাইলের ‘কেন্দ্রীয় মিশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা সেনাদের নিরাপত্তা ও ইসরাইলি জনপদের সুরক্ষার মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সমান্তরালে রাখা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘এই পদক্ষেপের পাশাপাশি আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সংলাপে রয়েছি; যাদের মধ্যে রয়েছেন- ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সচিব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূতরা- যারা সেন্টকম কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।’

একটি শুক্রবারের এন১২ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ইসরাইল সফরের সময় কাটজ তাকে জানান, যুদ্ধবিরতির পরও গাজার ৬০ শতাংশের বেশি হামাস সুড়ঙ্গ এখনো অক্ষত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, “ট্রাম্প পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজাকে নিরস্ত্রীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যৌথ মিশন হলো এই সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস করা।”

হামাস যোদ্ধাদের সরিয়ে নিতে আলোচনা : অন্য দিকে, দক্ষিণ গাজার ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’র পেছনে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা প্রায় ১৫০ জন হামাস যোদ্ধাকে অস্ত্র জমা দিয়ে মুক্তভাবে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে আলোচনা চলছে। সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই যোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি গাজায় এক মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মিসরীয় মধ্যস্থতাকারীরা প্রস্তাব দিয়েছেন, রাফাহে অবস্থানরত যোদ্ধারা যদি অস্ত্র মিসরের কাছে জমা দেন এবং সুড়ঙ্গগুলোর বিস্তারিত তথ্য দেন, তাহলে সেগুলো ধ্বংস করা যাবে। এই তথ্য রয়টার্সকে জানিয়েছেন একজন মিসরীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

তবে ইসরাইল ও হামাস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ইসরাইল সরকারের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ, এই ধরনের কোনো চুক্তির প্রচণ্ড বিরোধিতা করছেন, জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। এ দিকে রাফাহে ইসরাইলি হামলা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়, যা ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির পর থেকে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। এই হামলায় তিনজন ইসরাইলি সেনা নিহত হন, যার জবাবে ইসরাইল আরো হামলা চালায়, যাতে প্রায় ১৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।

ইসরাইলি চিফ অব স্টাফকে ১০০ রিজার্ভ সেনা ও কর্মকর্তার চিঠি : ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ এয়াল জামিরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে প্রায় ১০০ জন রিজার্ভ সেনা ও কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে তারা দাবি করেছেন যুদ্ধ চলাকালে একাধিক ঘটনায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মূল্যবোধে মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।

তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, সেনাবাহিনীর ‘অস্ত্রের পবিত্রতা’ নীতির ক্ষয় ঘটেছে, যা ইসরাইলি বাহিনীর নৈতিক আদর্শের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচার সংস্থা কেএএন জানায়, এই চিঠিটি চিফ অব স্টাফ এয়াল জামিরের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে এবং এতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত পদমর্যাদার রিজার্ভ সদস্যরা স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন ফ্রন্টে ইসরাইলি বাহিনীর আচরণ এবং সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত ক্ষতির বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তারা লিখেছেন, “গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে চলমান যুদ্ধের সময় এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে এখনো ঘটছে যা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চেতনা ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে না। এই মূল্যবোধেই আমরা বড় হয়েছি এবং আমাদের অধীন যারা কাজ করে, তাদের শিক্ষা দিয়েছি।”

তারা আরো বলেন, “যুদ্ধ শেষের পথে, এখন সময় এসেছে সেনাবাহিনীর নৈতিক ভিত্তিকে পুনরায় শক্তিশালী করার এবং গত দুই বছরে জারি করা আইন, নৈতিক কোড ও নির্দেশনার পরিপন্থী যেকোনো আচরণ কঠোরভাবে নির্মূল করার।” চিঠির শেষাংশে তারা জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের সামরিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যেখানে শৃঙ্খলা ও সেনাবাহিনীর মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য ভেঙে পড়ে, সেখানে সেনাদের কার্যকারিতা ও যুদ্ধজয়ের সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”