এলপিজি বাজারে কারসাজি বিপর্যয়ে ভোক্তারা

লাখো পরিবার জিম্মি সিন্ডিকেটের কাছে

পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রেখে লাখো পরিবারকে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে দলীয় মাফিয়া ব্যবসায়ীদের টাকা বানানোর জন্য, তারই ধারাবাহিকতায় এই বাজারকে কার্যত ছেড়ে দেয়া হয়েছে ওই সব প্রভাবশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলাফল, দাম বাড়ে খেয়ালখুশি মতো, সঙ্কট তৈরি হয় অদৃশ্য সমঝোতায়, আর সরকার থাকে ‘পর্যবেক্ষক’ ভূমিকায়।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশে এলপিজি এখন শুধু রান্নার জ্বালানি নয়- এটি রাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির ব্যর্থতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যেখানে পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রেখে লাখো পরিবারকে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে দলীয় মাফিয়া ব্যবসায়ীদের টাকা বানানোর জন্য, তারই ধারাবাহিকতায় এই বাজারকে কার্যত ছেড়ে দেয়া হয়েছে ওই সব প্রভাবশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলাফল, দাম বাড়ে খেয়ালখুশি মতো, সঙ্কট তৈরি হয় অদৃশ্য সমঝোতায়, আর সরকার থাকে ‘পর্যবেক্ষক’ ভূমিকায়।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েক সপ্তাহ যাবত এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে এক হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করা হলেও বাস্তবতা হলো, সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতা। প্রশ্ন হলো, এই নিয়ন্ত্রণহীনতা কি কাকতালীয়, নাকি নীতিগত অবহেলার সুযোগে একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত।

পুরো বাজার বেসরকারি হাতে : রাষ্ট্র কি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছে?

বাংলাদেশে এলপিজি আমদানি ও বিতরণ শত ভাগের কাছাকাছি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আজও সরাসরি এলপিজি আমদানিতে নেই। অথচ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) উৎপাদিত এলপিজি দিয়ে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ পূরণ করা হয়, যা কার্যত বাজারে কোনো প্রভাবই তৈরি করতে পারে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাজারে যদি কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয় বা একযোগে দাম বাড়ে, তা হলে সরকারের হাতে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করার মতো কার্যকর কোনো হাতিয়ার নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক অব্যবস্থাপনা নয়, এটি একটি নীতিগত দুর্বলতা, যা বছরের পর বছর ধরে সংশোধন করা হয়নি।

অবকাঠামোর অজুহাত : বাস্তবতা নাকি কৌশলী অস্বীকার?

বিপিসির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, তাদের নিজস্ব এলপিজি আমদানির অবকাঠামো নেই। জেটি নেই, স্টোরেজ নেই, টার্মিনাল নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশে যে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকা থেকে লাইটারিং জাহাজের মাধ্যমে নিয়মিত এলপিজি খালাস করছে, বিপিসি কি তাদের অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারে না?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশের ভাষ্য, বিপিসি চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেসরকারি অপারেটরদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে এলপিজি আমদানি শুরু করতে পারে। তা হলে কেন এই বিকল্পটি এতদিন করা হয়নি? এখানে কি প্রভাবশালী আমদানিকারকদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন জড়িত?

দাম নির্ধারণে অস্বচ্ছতা : নিয়ন্ত্রক কি দর্শক?

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য মানা হয় কতটা? ভোক্তাদের অভিযোগ, ঘোষিত দাম কাগজে থাকে, বাজারে থাকে ভিন্ন দাম। প্রশ্ন হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি কোথায়? যদি একটি পণ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নিয়ন্ত্রিত মূল্য’ তালিকায় থাকে, অথচ বাস্তবে সেটি কার্যকর হয় না, তা হলে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা কি কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে সীমাবদ্ধ? এই শিথিলতা কি বাজার কারসাজির লাইসেন্স নয়?

জি-টু-জি আমদানি : কেন এলপিজিতে প্রয়োগ নেই?

বাংলাদেশ সরকার অতীতে জ্বালানি তেলের সঙ্কট মোকাবেলায় একাধিকবার জি-টু-জি আমদানির পথ বেছে নিয়েছে। বিপিসির তালিকাভুক্ত জি-টু-জি সরবরাহকারীরা বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান, যারা এলপিজিসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে সক্ষম। তা হলে প্রশ্ন উঠছে, ডিজেল বা অকটেনের ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যৌক্তিক হয়, এলপিজির ক্ষেত্রে তা কেন ‘বাজারবিরোধী’ হিসেবে দেখা হয়? নাকি এখানে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত, যাদের কারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত বারবার আটকে যাচ্ছে?

কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ : তদন্ত হবে কবে?

এলপিজি বাজারে কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ নতুন নয়। সরবরাহ কম দেখিয়ে দাম বাড়ানো, ডিলার পর্যায়ে মজুদ রেখে বাজারে চাপ সৃষ্টি, এসব অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো বড় তদন্ত বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। এই নীরবতা কি বাজারকে বার্তা দিচ্ছে যে, কারসাজির ঝুঁকি নেই? ভোক্তারা প্রশ্ন করছেন, রাষ্ট্র কি কেবল দাম বাড়ার পর ‘দুঃখ প্রকাশ’ করবে, নাকি দায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেবে?

ভোক্তা নয়, কার স্বার্থ অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

এলপিজি বাজারে বিপিসির সম্ভাব্য প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক যতটা নীতিগত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। কারণ, এতে বর্তমান বাজার কাঠামোতে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তৈরি হবে। আর সেটাই কি সবচেয়ে বড় বাধা?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিপিসির সীমিত পরিসরে এলপিজি আমদানি মানে বাজার দখল নয়, বরং সঙ্কটকালে একটি বার্তা দেয়া যে, সরকার প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করবে। এই বার্তাটিই হয়তো কেউ কেউ চান না।

রাষ্ট্র কি দর্শকই থাকবে?

এলপিজি বাজারে চলমান অরাজকতা কেবল একটি পণ্যের সঙ্কট নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিগত সাহসের পরীক্ষা। বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয়া মানে মুক্তবাজার ধ্বংস করা নয়, বরং ভোক্তা সুরক্ষার একটি ন্যূনতম নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। প্রশ্ন একটাই, রাষ্ট্র কি ভোক্তার পাশে দাঁড়াবে, নাকি এলপিজি বাজারে চলমান নীরব লুটপাটের সামনে চোখ বন্ধ রেখেই ‘বাজারই ঠিক করবে’ নীতিতে অটল থাকবে?