নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে আবারো অস্বস্তি বাড়ছে। আটা, ময়দা ও চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি খোলা ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। একই সাথে মাছ, গোশত ও ডিমের দাম দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এ দিকে সবজির দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে বর্তমানে প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও একই আটা ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে।
এ দিকে চিনির বাজারেও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ১০ টাকা বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে চিনির দাম বাড়ার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। মিরপুর-৬ বাজারের এক বিক্রেতা জানান, কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সামনে প্যাকেটজাত চিনির দামও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। অনেক দোকানে চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং খোলা পাম তেলের দাম ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা লিটারে উঠেছে।
সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। কয়েক সপ্তাহ আগে সরবরাহ সঙ্কটে অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন সরবরাহ বাড়ায় বেশির ভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা যায় পটোল, পেঁপে ও ঢ্যাঁড়সের দাম তুলনামূলক কম। কাঁচামরিচের দামও কিছুটা কমেছে। গতকাল রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির সুযোগ দেয়ার পর সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। তবে পেঁয়াজ ও আলুর দামে বড় কোনো পরিবর্তন নেই। মানভেদে পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ দিকে ডিমের বাজারে অস্বস্তি কাটেনি। বাজারে সাদা ডিমের ডজন প্রায় ১৩০ টাকা এবং বাদামি ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে ডজনপ্রতি দাম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। প্রায় এক মাস ধরে ডিমের দাম তুলনামূলক ঊর্ধ্বগতি রয়েছে।
গোশতের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং দেশী মুরগি প্রায় ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
মাছের বাজারের চিত্র আরো কঠিন। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বড় রুইয়ের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং দেশী কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে। ইলিশের দামও আকাশছোঁয়া, ৯০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং এক কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দুয়ারীপাড়া বাজারের এক ক্রেতা বলেন, এখন ২৫০ টাকার নিচে ভালো মাছ পাওয়া কঠিন। তেলাপিয়াও ২৫০ টাকা কেজি। মাছ, মুরগি ও ডিম কিনতেই সংসারের বড় একটি অংশের আয় চলে যাচ্ছে। আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের বাজার খরচ বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ ও পাইকারি বাজারের দামের পরিবর্তনই বিভিন্ন পণ্যের খুচরা দামে প্রভাব ফেলছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, একদিকে আটা, তেল ও চিনির মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, অন্য দিকে মাছ, গোশত ও ডিমের দামও উচ্চপর্যায়ে থাকায় পরিবারের খাদ্যব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক পণ্য কিনতে ব্যয় হয়। ফলে বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিক ব্যয় কমছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আটা, ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো বহুল ব্যবহৃত পণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সাথে মাছ, গোশত ও ডিমের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকায় খাদ্যতালিকায় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক পরিবার। নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বাজার তদারকি জোরদার এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



