বিশেষ সংবাদদাতা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির তৃতীয় দিনে আরো ৪১ জন প্রার্থী বৈধতা ফিরে পেয়ে নির্বাচনের মাঠে ফিরেছেন। ফলে তিন দিনের শুনানিতে মোট ১৫০ জন প্রার্থী আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেলেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দিনে ৭১টি আপিল শুনানির মধ্যে ৪১টি মঞ্জুর, ২৫টি খারিজ এবং চারটি আপিল অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘তৃতীয় দিনের শুনানিতে ৪১ জন প্রার্থীর আপিল মঞ্জুর হয়েছে।’
তবে একই সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ তুলেছেন, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে এবং পরিকল্পিতভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে।
কমিশনের শুনানি ও পরিসংখ্যান : আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে পূর্ণ কমিশনের উপস্থিতিতে তৃতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এদিন মোট ৭০টি আপিল শুনানির জন্য নির্ধারিত ছিল। আগের দিনের একটি স্থগিত রায় যুক্ত হওয়ায় মোট ৭১টি আপিলের শুনানি সম্পন্ন হয়।
আপিলকারীরা এবং তাদের পক্ষে আইনজীবীরা মনোনয়নপত্র বৈধ করার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী : মঞ্জুর ৪১ জন; খারিজ ২৫ জন; অপেক্ষমাণ চার জন। রিটার্নিং কর্মকর্তারা যেসব কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন, তার মধ্যে রয়েছে- এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরসংক্রান্ত অসঙ্গতি, স্বাক্ষর যাচাইয়ের জটিলতা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপির অভিযোগ।
ইসি সূত্র জানায়, প্রথম তিন দিনে মোট ২১০টি আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৫১ জনের আপিল মঞ্জুর, ৪৭ জনের আপিল খারিজ এবং বাকি কয়েকটি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে।
কয়েকটি আপিল স্থগিত ও প্রত্যাহার; ইসির জনসংযোগ বিভাগের তথ্যমতে, পাবনা-২ আসনে নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ১৬১/২০২৬ নম্বর আপিলটির শুনানি হয়নি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাকিলা ফারজানা তার দায়ের করা ১৫৭/২০২৬ নম্বর আপিল প্রত্যাহার করে নেন।
রোববারের শুনানিতে অপেক্ষমাণ থাকা ময়মনসিংহ-৪ আসনের ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী মো: হামিদুল ইসলামের আপিল মঞ্জুর হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ২১১ থেকে ২৮০ নম্বর আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে এই শুনানি চলবে।
মাঠপর্যায়ে স্বতন্ত্রদের বাদ দেয়ার চেষ্টা চলছে : হাসনাত কাইয়ূম
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর বলেন, মাঠপর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে মতবিনিময়ে দেখা গেছে, অনেকের অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও ভয়াবহ। বিপুল সংখ্যক আপিল ও আপিল মঞ্জুরের হারই প্রমাণ করে- রিটার্নিং কর্মকর্তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবে কতটা প্রভাবিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ধরনের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন পরিচালিত হলে কোনোভাবেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।’
নির্বাচন কমিশনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, এখনো পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে নির্বাচন পরিচালনা করা হচ্ছে, যেখানে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তার বদলে আমলারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে নির্বাচনপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, এটি সংবিধান সংস্কারের দিকেও যেতে পারে। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে দেশ বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।’
ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের অভিযোগ : ‘পরিকল্পিতভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঠেকানো হচ্ছে’
গোপালগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলমের পক্ষে আপিল শুনানিতে অংশ নেয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির অভিযোগ করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঠেকাতে পরিকল্পিতভাবে আপত্তি তোলা হচ্ছে, কাগজপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং শুনানিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মনোনয়নপত্রে একটি স্বাক্ষর নিয়ে আপত্তি তোলা হয়, অথচ সংশ্লিষ্ট ভোটারের স্বাক্ষরের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তারপরও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, শুনানিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও এসে আপত্তি তুলে পরিবেশ উত্তপ্ত করেন, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জামায়াত প্রার্থীর আপিল খারিজ; চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের আপিল দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হওয়ায় খারিজ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আপিল আদালত রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। ফজলুল হক অভিযোগ করে বলেন, তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে এবং অন্য দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘাটতি উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান।
জাতীয় পার্টির ৩ প্রার্থী টিকলেন; জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী জানান, টাঙ্গাইল-৬ আসনের মামুনুর রহিম, জামালপুর-১ আসনের এ কে এম ফজলুল হক এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের মো: আব্দুর রশিদ প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তবে সুনামগঞ্জ-৫ ও মানিকগঞ্জ-২ আসনের দুই প্রার্থীর আপিল খারিজ হয়েছে।
সোমবার যাদের মনোনয়ন বৈধ হলো : বগুড়া-২ গণ অধিকার পরিষদ সেলিম সরকার, ময়মনসিংহ-৪ সুপ্রিম পার্টি লিয়াকত আলী, গাজীপুর-৩ স্বতন্ত্র ইজাদুর রহমান চৌধুরী, খাগড়াছড়ি গণ অধিকার পরিষদ দীনময় রোয়াজা ও স্বতন্ত্র সোনা রতন চাকমা, ঢাকা-১২ জনতার দল ফরিদ আহমেদ, গাজীপুর-২ গণফ্রন্ট আতিকুল ইসলাম, গাজীপুর-১ গণফ্রন্ট আতিকুল ইসলাম, ঢাকা-১৪ স্বতন্ত্র সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, মৌলভীবাজার-২ স্বতন্ত্র এম জিমিউর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ গণ অধিকার পরিষদ আরিফুল হক, খুলনা-১ গণ অধিকার পরিষদ জি এম রোকনুজ্জামান, চাঁদপুর-১ গণফোরাম আজাদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-৩ স্বতন্ত্র আতাউর রহমান আতা, কিশোরগঞ্জ-৫ স্বতন্ত্র এ এইচ এম কাইয়ুম, টাঙ্গাইল-৬ জাতীয় পার্টি মামুনুর রহিম, নারায়ণগঞ্জ-৫ স্বতন্ত্র মাকসুদ হোসেন, নাটোর-১ গণসংহতি আন্দোলন সেন্টু আলী, কুমিল্লা-৯ বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস মাহবুবুর রহমান, রংপুর-৫ এবি পার্টি আব্দুল বাছেত, লক্ষ্মীপুর-২ এবি পার্টি কেফায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম-৭ এবি পার্টি আব্দুর রহমান, মেহেরপুর-১ এনসিপি সোহেল রানা, ঢাকা-১৬ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আহসানউল্লাহ, জামালপুর-১ জাতীয় পার্টি এ কে এম ফজলুল হক, গাইবান্ধা-৩ স্বতন্ত্র এস এম খাদেমুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-৭ খেলাফত মজলিস নজরুল ইসলাম, ফেনী-৩ ইনসানিয়াত বিপ্লব হাসান আহমদ, রংপুর-৩ বাসদ আনোয়ার হোসেন বাবলু, সুনামগঞ্জ-১ নেজামে ইসলাম পার্টি মুজ্জামিল হক তালুকদার, রাজবাড়ী-২ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৯ নাগরিক ঐক্য নুরুল আবছার মজুমদার, নারায়ণগঞ্জ-১ স্বতন্ত্র মোহাম্মদ দুলাল, কিশোরগঞ্জ-২ গণ অধিকার পরিষদ শফিকুল ইসলাম, বরগুনা-২ স্বতন্ত্র রাশেদ উদ জামান, মানিকগঞ্জ-৩ এবি পার্টি রফিকুল ইসলাম, ফরিদপুর-১ বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি মৃন্ময় কান্তি দাস, ঢাকা-১৬ মুক্তিজোট আবদুল কাদের জিলানী, সাতক্ষীরা-৪ জাতীয় পার্টি আবদুর রশীদ, গোপালগঞ্জ-১ স্বতন্ত্র আশ্রাফুল আলম ও ময়মনসিংহ-৪ ন্যাশনাল পিপলস পার্টির হামিদুল ইসলাম।
যাদের আপিল খারিজ হয়েছে : সুনামগঞ্জ-৫ জাতীয় পার্টি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ব্রাহ্মবাড়িয়া-১ স্বতন্ত্র সৈয়দ নজরুল ইসলাম, যশোর-১ স্বতন্ত্র শাহজাহান আলী গোলদার, রাজবাড়ী-২ স্বতন্ত্র সোহেল মোল্লা, ঝিনাইদহ-১ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আলম বিশ্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ স্বতন্ত্র হাবিবুর রহমান, যশোর-২ স্বতন্ত্র মেহেদী হাসান, মেহেরপুর-১ স্বতন্ত্র মাহবুব রহমান, কুমিল্লা-১ স্বতন্ত্র ওমর ফারুক, ঢাকা-১১ স্বতন্ত্র কহিনুর আক্তার বিথি, গোপালগঞ্জ-১ স্বতন্ত্র আশ্রাফুল আলম, ভোলা-৪ স্বতন্ত্র মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ভোলা-১ স্বতন্ত্র রফিজুল ইসলাম, ভোলা-৩ স্বতন্ত্র রহমান উল্যাহ, ঢাকা-৮ নিউক্লিয়াস পার্টি বাংলাদেশ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসাইন, চট্টগ্রাম-৩ স্বতন্ত্র মোয়াহেদুল মাওলা, নাটোর-২ ন্যাশনাল পিপলস পার্টি জি এ এ মুবিন, চাঁদপুর-২ স্বতন্ত্র তানবীর হুদা, ফেনী-২ স্বতন্ত্র মোহাম্মদ ইসমাইল, চট্টগ্রাম-৯ বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর ডা: এ কে এম ফজলুল হক, মানিকগঞ্জ-২ জাতীয় পার্টি এস এস আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১৮ গণ অধিকার পরিষদ এম এম আহসান হাবিব, চট্টগ্রাম-১১ গণ অধিকার পরিষদ মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন, মাদারীপুর-১ স্বতন্ত্র ইমরান হাসান।



