সরকারে গেলে নারীদের নিরাপত্তায় জোর দেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সম্প্রতি প্রত্যাশার বাংলাদেশ শীর্ষক নীতি সম্মেলনেও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেছে দলটি। নারী সহায়ক বাংলাদেশ গঠন করতে ইতোমধ্যে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে জামায়াত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে দু’টি জোটের লড়াই চলছে। বিএনপি বিগত সময়ে একাধিকবার সরকার গঠন করেছে, যার মধ্যে দু’টিতে ক্ষমতার অংশীদার ছিল জামায়াতও। তবে এ পর্যন্ত জামায়াতের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়নি। তবে জামায়াতের দু’জন শীর্ষ নেতা তিনটি মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। এ ছাড়া বেশির ভাগ সংসদেই তাদের প্রতিনিধি ছিল। এবার বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীরও সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী ধর্মভিত্তিক দল হওয়ায় তাদের ক্ষমতার যাওয়ার সম্ভাবনায় কয়েকটি বিষয়ে দেশে-বিদেশে চিন্তা-উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামে নারীদের পর্দা ফরজ করা হয়েছে। জামায়াতের মহিলা শাখার নেত্রীরা নিজেরা বোরকা ও হিজাব- নেকাব পরেন। সেক্ষেত্রে জামায়াত ক্ষমতায় আসলে কি সব নারীদের বোরকা, হিজাব-নেকাব পরতে বাধ্য করবে? জামায়াত আমিরের সাথে যেসব দেশের রাষ্ট্রদূত সাক্ষাৎ করেছেন তাদের অন্যতম প্রশ্নও ছিল নারীদের স্বাধীনতা থাকবে কি না? তারা রাস্তাঘাটে চলতে পারবে কি না? তাদের ঘরবন্দী করা হবে কি না? চাকরি করতে পারবে কি না? ইত্যাকার নানা প্রশ্ন রয়েছে দেশের মানুষের মাঝেও। তবে বিষয়টি ক্রমেই পরিষ্কার করছেন জামায়াত নেতারা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পলিসি সামিটে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা জানিয়েছেন, পর্দা করা ফরজ। কিন্তু জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কারো প্রতি পর্দার বিষয়টি চাপিয়ে দেবে না। কেউ নিজের ইচ্ছায় পর্দা মেনে চলতে পারবেন, আবার কেউ যদি না চান তাহলে তাকে বাধ্য করা হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালাও এমনটিই বলেছেন-কারো প্রতি কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না। এ দিকে জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান তার দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ৪৩ ভাগ নারী রয়েছে জানিয়ে বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায় যাতে রাস্তাঘাট-কর্মক্ষেত্র থেকে সব জায়গায় নারীরা নিরাপদে থাকতে পারে। গভীর রাতেও যেন একাকি একজন নারী শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্ভয়ে-নির্বিঘœ চলতে পারেন সে রকম পরিবেশ তৈরি করতে চান তারা। এর আগে বিদেশে গিয়ে এক বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেছিলেন, তারা সরকার গঠন করলে কর্মজীবী মায়েদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেবেন।
গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনী সমাবেশের প্রথম দিনে জামায়াত আমির স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, নারী-পুরুষ সবাই মিলে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলব। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সব সহ্য করব, মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর আঘাত সহ্য করা হবে না। নারীর প্রতি কোনো ধরনের সহিংসতা চলতে দেয়া হবে না।
এ ছাড়া জামায়াতের বিভিন্ন নেতা তাদের বক্তব্যে নারীদের চাকরি করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা নয় বরং সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন। এমনকি নারীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যাক্তা তৈরিতে উদ্যোগ নেবেন তারা।
সম্প্রতি দলটি নারী সহায়ক বাংলাদেশ গঠন করতে একটি রূপরেখা দিয়েছে। গৃহীত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-১. কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ ২. পিক-আওয়ারে বিআরটিসির দোতলা বাসে নারীদের জন্য আলাদা কম্পার্টমেন্টের ব্যবস্থা, ৩. নারী সহায়ক নগর পরিকল্পনার লক্ষ্যে পাবলিক টয়লেট, ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও নামাজের জায়গার ব্যবস্থা, ৪. জরুরি প্রয়োজনে ইমারজেন্সি কল নাম্বার থাকবে, ৫. গণপরিবহনে বাধ্যতামূলক সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ৬. নারীর নিরাপত্তায় ইমারজেন্সি পোল স্থাপন, ৭. পিক-আওয়ারে নারীদের জন্য বাসের আলাদা ট্রিপ, ৮. নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা প্রদান ইত্যাদি।
এ ছাড়া জামায়াতের পলিসি সামিটে বলা হয়, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তবে সামিটে জামায়াতকে প্রশ্ন করা হয়, তারা নারীদের ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী করেনি কেন? জবাবে জামায়াতের ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বর্তমানে দেশে যে পরিস্থিতি তাতে একজন প্রার্থীকে নানা ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয়, দেশের রাজনীতি এখনো সেভাবে নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। এ কারণে তারা এ নির্বাচনে নারী প্রার্থী দিতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারলে নারীপ্রার্থী দেয়ার বিষয়ে চিন্তা রয়েছে বলেও জানান। সামিটে টেলিভিশন টকশোগুলোতে অংশ নেয়া জামায়াতের নারী প্রতিনিধি প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ জানান, বিগত সময়ে জামায়াতের নারীরা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী সংসদেও জামায়াতের নারী নেত্রীদের প্রতিনিধি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।



