সুদের চাপের বৃত্তে অর্থনীতি

আমানত-ঋণ ব্যবধান বাড়ছেই, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও এসএমই

গড় আমানত সুদ সামান্য ওঠানামা করলেও ঋণের সুদ স্থিতিশীলভাবে উচ্চ থাকায় সামগ্রিক স্প্রেড কমার কোনো লক্ষণ নেই।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান আশঙ্কাজনকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ প্রকাশিত আগস্ট থেকে নভেম্বর ২০২৫ সময়কালের ওজনযুক্ত গড় সুদের হার (ডব্লিউএআইআর) বিশ্লেষণে দেখা যায়- গড় আমানত সুদ সামান্য ওঠানামা করলেও ঋণের সুদ স্থিতিশীলভাবে উচ্চ থাকায় সামগ্রিক স্প্রেড কমার কোনো লক্ষণ নেই।

সামগ্রিক চিত্র : স্প্রেড ৫.৭-৫.৮ শতাংশের ঘরে : নভেম্বর ২০২৫-এ সব ব্যাংকের গড় আমানত সুদ দাঁড়িয়েছে ৬.৩৬ শতাংশ, বিপরীতে গড় ঋণ সুদ ১২.১৪ শতাংশ- ফলে সার্বিক স্প্রেড ৫.৭৮ শতাংশ। অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরেও এই ব্যবধান প্রায় একই ছিল। অর্থাৎ, টানা চার মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে সুদের চাপ কার্যত অপরিবর্তিত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ স্প্রেড বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বনাম বেসরকারি ব্যাংক : কার চাপ বেশি : তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়- রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গড় স্প্রেড নভেম্বর ২০২৫-এ প্রায় ৫.৭ শতাংশ; বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে তা কিছুটা কম, তবে এখনো ৫.৬ শতাংশের ওপরে; বিদেশী ব্যাংকগুলোতে স্প্রেড সবচেয়ে বেশি- অনেক ক্ষেত্রে ৮-১০ শতাংশের কাছাকাছি। বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটি ব্যাংক, এইচএসবিসি-এর মতো ব্যাংকে আমানত সুদ খুবই কম (১-৩ শতাংশ), কিন্তু ঋণ সুদ ১০-১১ শতাংশের ওপরে থাকায় ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বড়।

শিল্প, এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণের চিত্র : খাতভিত্তিক ঋণ সুদের হার বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগ আরো স্পষ্ট হয়- বড় শিল্প খাতে গড় ঋণ সুদ : প্রায় ১২.৫ শতাংশ; এসএমই খাতে : অনেক ব্যাংকে ১৩-১৫ শতাংশ, কিছু ক্ষেত্রে আরো বেশি এবং কৃষি খাতে : গড় সুদ তুলনামূলক কম হলেও এখনো ১১.৭-১২ শতাংশের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসএমই খাতে এত উচ্চ সুদ কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয়ের জন্যই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

কেন কমছে না স্প্রেড : ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, স্প্রেড না কমার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে- উচ্চ খেলাপি ঋণ : ঝুঁকি সামলাতে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ কমাতে অনিচ্ছুক; তহবিল সঙ্কট ও তারল্য চাপ : আমানত ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে হচ্ছে; দুর্বল প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ ও পুনঃতফসিল সংস্কৃতি।

এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সঙ্কেত সত্ত্বেও বাজারে সুদের বাস্তব চাপ কমছে না।

অর্থনীতিতে প্রভাব : বিনিয়োগ স্থবিরতার শঙ্কা : অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ৫-৬ শতাংশের ওপরে স্প্রেড বজায় থাকলে- নতুন শিল্প বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে; এসএমই উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন; উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার চাপ পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান-দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শিল্প ও এসএমই বিনিয়োগে বাড়ছে ঝুঁকি : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান এখন একটি কাঠামোগত সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ প্রকাশিত নভেম্বর ২০২৪ ও নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মাসভিত্তিক ডব্লিউএআইআর এবং ব্যাংকভিত্তিক সুদের হার বিশ্লেষণে দেখা যায়- গত দেড় বছরে আমানতের সুদ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, তবে তার চেয়েও দ্রুত ও স্থায়ীভাবে বেড়েছে ঋণের সুদ। ফলে স্প্রেড কমার বদলে দীর্ঘ সময় ধরে ৫.৭-৫.৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।

সামগ্রিক চিত্র : এক বছরে কী বদলেছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী- নভেম্বর ২০২৪ এ গড় আমানত সুদ (১ বছর ও তদূর্ধ্ব) : ৯.০৭%; গড় ঋণ সুদ : ১১.৮৪% এবং স্প্রেড: ৫.৮৬%। আর এক বছর পর নভেম্বর ২০২৫ এ গড় আমানত সুদ: ৯.৭১%; গড় ঋণ সুদ : ১২.১৪% এবং স্প্রেড : ৫.৭৮%।

অর্থাৎ এক বছরে আমানত সুদ প্রায় ০.৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, ঋণ সুদ বেড়েছে প্রায় ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট, কিন্তু স্প্রেড কার্যত অপরিবর্তিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সুদের উচ্চচাপ এখন আর সাময়িক নয়- এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে প্রোথিত হয়ে গেছে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণ : কারা বেশি চাপ দিচ্ছে?

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নভেম্বর ২০২৫-এ গড় আমানত সুদ : ৮.৪৪%; গড় ঋণ সুদ : ১১.১৪% এবং স্প্রেড : ৫.৭৭%। সোনালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে স্প্রেড ৬.৩০%, রূপালী ব্যাংকে ৬.২৮%, যা তুলনামূলকভাবে বেশি। অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণের চাপ সামাল দিতে ঋণের সুদ উঁচু রেখেছে।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক : বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে চিত্র আরো উদ্বেগজনক- গড় আমানত সুদ : ৯.৪২%; গড় ঋণ সুদ : ১২.১২%; স্প্রেড : ৫.৬৭%্ কিছু ব্যাংকে স্প্রেড অত্যন্ত বেশি : ডাচ-বাংলা ব্যাংক : স্প্রেড প্রায় ৯.৯৭%; আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক : ১০.৪৭%; পদ্মা ব্যাংক : ৭.৫৮% এবং ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক : ৮.০৩%।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম ঋণের সুদে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক : সবচেয়ে বড় ব্যবধান : বিদেশী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র আরো বৈপরীত্যপূর্ণ- গড় আমানত সুদ : মাত্র ১-৩%; গড় ঋণ সুদ : ১০-১৬% আর স্প্রেড : অনেক ক্ষেত্রে ৯-১৩%।

উদাহরণ স্বরূপ : স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক : আমানত ০.৫৬%, আয় ১০.৮৬% আর স্প্রেড ১০.৩০%; ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তান : স্প্রেড ১৩.৯০%; এইচএসবিসি : স্প্রেড প্রায় ৮.৫৯%।

এতে স্পষ্ট, বিদেশী ব্যাংকগুলো কম আমানতে উচ্চ মার্জিনে ঋণ দিয়ে বাজারে বড় মুনাফা করছে।

খাতভিত্তিক ঋণের চাপ : এসএমই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত : নভেম্বর ২০২৫-এ খাতভিত্তিক গড় ঋণ সুদ- বড় শিল্প খাত : ১২.৪৭%; এসএমই খাত : ১২.৬৮% এবং কৃষি খাত : ১১.৭৩%।

এসএমই খাতে অনেক ব্যাংকে সুদ ১৪-১৬ শতাংশ পর্যন্ত, যা নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় বাধা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসএমই খাতে এই উচ্চ সুদ কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা : স্প্রেড কেন নামছে না : মাসভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়- সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ স্প্রেড ছিল ৩.৩১%; নভেম্বর ২০২৪-এ বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৮৬% এবং নভেম্বর ২০২৫-এও প্রায় একই (৫.৭৮%)

এই স্থবিরতার পেছনে রয়েছে- উচ্চ খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফসিল সংস্কৃতি, ব্যাংক শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ, অপারেশনাল ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং তারল্য ঝুঁকি সামাল দিতে অতিরিক্ত সুদ আরোপ।

অর্থনীতিতে প্রভাব : বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্কট : বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ৫-৬ শতাংশের বেশি স্প্রেড বজায় থাকলে- নতুন শিল্প বিনিয়োগ কমবে, এসএমই উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার চাপ পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদসংক্রান্ত নীতিগত সঙ্কেত থাকলেও বাস্তবে সুদের ব্যবধান কমছে না। খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং ঝুঁকিহীন ঋণ সংস্কৃতি গড়ে না তুললে উচ্চ সুদের এই বৃত্ত ভাঙা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নীতিগত নির্দেশনা নয়- খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি, ব্যাংক শাসনে সংস্কার এবং প্রশাসনিক ব্যয় কমানো ছাড়া সুদের ব্যবধান কমানো সম্ভব নয়। অন্যথায়, সুদের এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ ২০২৬ সালেও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।