আদালতের স্থিতাবস্থা থামেনি ‘বাংলা ব্লকেড’

Printed Edition

হারুন ইসলাম

কোটা সংস্কার আন্দোলনের দশম দিন। সকাল থেকেই যেন দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। এক দিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কোটা-সংক্রান্ত মামলার শুনানি, অন্য দিকে রাজপথে হাজারো শিক্ষার্থীর দৃঢ় উচ্চারণ, ‘আদালতের আদেশ নয়, চাই স্থায়ী সমাধান।’

ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, ফার্মগেট, মিরপুর, আগারগাঁও, কাওরানবাজার, একটির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কজুড়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান। একই সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, জাহাঙ্গীরনগর, গাজীপুর, বরিশাল, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও নেমে আসেন রাজপথে। আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচি ছিল সকাল ১০টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’।

দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে সুপ্রিম কোর্টে। আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ চার সপ্তাহের জন্য হাইকোর্টের রায়ের ওপর ‘স্থিতাবস্থা’ (স্ট্যাটাস কো) জারি করেন। এর ফলে ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র যার মাধ্যমে কোটাব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল তা আপাতত বহাল থাকে। একই সাথে আদালত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

কিন্তু আদালতের এই আদেশ আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি। আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এটি কেবল একটি সাময়িক আইনি ব্যবস্থা। তাদের দাবি ছিল প্রশাসনিক বা বিচারিক নয়, আইনগত ও নীতিগত সংস্কার। সংসদের মাধ্যমে বৈষম্যহীন কোটা সংস্কারের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

সকালের পর থেকেই রাজধানী কার্যত অচল হয়ে পড়ে। শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে চার দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সায়েন্স ল্যাবে ঢাকা কলেজ ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরোধ করেন। মিরপুর, ফার্মগেট, আগারগাঁও, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। তবে জরুরি সেবা হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়।

শুধু সড়ক নয়, রেল যোগাযোগেও বড় প্রভাব পড়ে। কাওরানবাজার রেলক্রসিংয়ে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখেন। এতে দেশের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ঢাকার রেলযোগাযোগ ব্যাহত হয়। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেওয়ানহাট এলাকায় রেললাইন অবরোধ করলে একাধিক ট্রেন আটকা পড়ে। গাজীপুরে ডুয়েটের শিক্ষার্থীরাও রেলপথে অবস্থান নেন।

ঢাকার বাইরে আন্দোলনের বিস্তার ছিল আরো উল্লেখযোগ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পায়রা সেতু এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, ‘বৈষম্য নয়, মেধার বাংলাদেশ চাই।’

এদিন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বুয়েট, বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষার্থীরাও একযোগে কর্মসূচিতে অংশ নেন।

অন্য দিকে, শাহবাগ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের ব্যানারে কোটা বহালের দাবিতে একটি সংক্ষিপ্ত কর্মসূচিও পালিত হয়। যদিও তা আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির তুলনায় সীমিত ছিল।

দিনভর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল। বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সন্ধ্যার পর একে একে অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা। রাজধানীতে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও আন্দোলনের উত্তাপ কমেনি।

১০ জুলাইয়ের আরেকটি তাৎপর্য ছিল আন্দোলনের ভাষা ও কৌশলের পরিবর্তন। প্রথম দিকের দাবি ছিল হাইকোর্টের রায় বাতিলের দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এদিন থেকে আন্দোলনকারীরা আরো স্পষ্টভাবে আইন করে কোটা সংস্কার, বৈষম্যহীন নিয়োগব্যবস্থা এবং স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তনের দাবি সামনে আনেন। আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশ তাদের কাছে চূড়ান্ত সমাধান নয়- এ বার্তা সেদিন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১০ জুলাই ছিল আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ অনেকের কাছে আন্দোলন থামার সম্ভাবনা তৈরি করলেও রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীরা সেই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন।