আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলের নির্বাচনে নির্ধারিত প্রার্থীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিতো পুলিশ। এর পর ওই প্রার্থীর আর কোনো দায়িত্ব থাকতো না। তিনি শুধু লোক দেখানোর জন্য কিছু দৌড়-ঝাঁপ করতেন। আর বাকি কাজ করে দিতেন টাকা নেয়া ওই পুলিশ সদস্যরা।
১৬ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তেমনি অভিযোগ উঠছে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে ওই কর্মকর্তারা একটি দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে তাদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। একই সাথে বিরোধীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানি, নাজেহাল ও মানহানির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, হাসিনাকে ডুবিয়ে এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন পুলিশের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা। এরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে নানা রূপ ধারণ করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন।
যদিও পুলিশ প্রধান বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হবে।
আওয়ামী সরকারের সময়ে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিগত নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীদের পাস করানোর দায়িত্ব থাকতো পুলিশের ওপর। সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা পাওয়ার পর পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, দায়িত্বই যখন পালন করতে হবে, তখন ওই প্রার্থীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে হবে। এর পর প্রার্থীর সাথে চুক্তি করে তার কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা (কোটি টাকার উপরে) নেয়া হতো। টাকাগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় নিয়ে বিভিন্ন অঙ্কে প্যাকেটজাত করা হতো। এর পর কিছু প্যাকেট নিয়ে সেই থানার আওতায় থাকা ভোট কেন্দ্রে চলে যেতো পুলিশ। কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসারকে ডেকে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার একটি প্যাকেট এবং সহকারী অফিসারদের ৩০ থেকে ২০ হাজার করে থাকা টাকার প্যাকেট দেয়া হতো।
প্যাকেটগুলো দিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বলা হতো ‘এই প্যাকেট নিলেও আমরা যেভাবে বলবো, সেভাবে করবেন। আর না নিলেও আমরা যেভাবে বলবো সেভাবেই করবেন। নেয়া না নেয়ার সিদ্ধান্তটা আপনাদের’। পুলিশের এমন আচরণের প্রতিবাদে কেউ কোনো কথা বলতে চাইলে তাকে কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে এমন ভীতি সৃষ্টি করা হতো যে সেই দৃশ্য দেখে বা শুনে আর কেউ দ্বিতীয়বার কোনো শব্দ উচ্চারণের সাহস করতেন না। বাধ্য হয়ে টাকাগুলো নিয়ে চুপ করে থাকতেন। হাসতে হাসতে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এসব করতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে যে কেন্দ্রে ভোটের সংখ্যার চাইতে বেশি কাষ্ট হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি।
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও এমনই কিছু অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সিলেক্টিভ কিছু প্রার্থীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে দলীয়করণ ও ভোট কারচুপির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে, যা বিগত সরকারের সময় করা হতো। অভিযোগ উঠছে নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি থানাসহ বেশ কিছু এলাকায় পুলিশের কিছু কর্মকর্তা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রার্থীদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন। ওই সুবিধার কারণে প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের ইচ্ছাকৃত নাজেহাল করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ করা হচ্ছে নিজের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে লিগ্যালভাবে টাকা নেয়ার পরও গতকাল সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে হেনস্তা করা হয়। অথচ তিনি ঢাকা বিমানবন্দরকে টাকা বহনের কথা জানিয়েই সৈয়দপুর গিয়েছিলেন। তার পরও তাকে নাজেহাল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানবন্দরে নাটক সাজানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে আইজিপি বাহারুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি। ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখেন। আমরা নিরপেক্ষ কি না? এর পরেও কেউ এমন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, পুলিশে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের সংস্কৃতি, অভ্যাস আমরা এক বছরে দূর করতে পারিনি। এটি আমাদের সেই পুরনো ফোর্স, শুধুমাত্র যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যে বড় অংশ রয়েছে সেগুলো আগের সেই পুরনো ফোর্সই। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে ইনসিডেন্টগুলো হয়। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে শুদ্ধতা আনার।



