ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে অপহরণের ঘটনায় জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক হামলার পর এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, সিবিসি নিউজ, এনবিসি নিউজ ও আলজাজিরা।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে আটক করা আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে থাকা ডেনমার্ক ও মেক্সিকোও জানিয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ নিউ ইয়র্কে জরুরি বৈঠক করে। একই দিনে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মার্কিন মামলার শুনানি শুরু হয়।
জাতিসঙ্ঘে ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাডা এই অভিযানকে ‘আইনি ভিত্তিহীন একটি অবৈধ সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে নিন্দা জানান। তার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় কিউবা, কলম্বিয়া এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীনের কণ্ঠেও। কিউবার রাষ্ট্রদূত আর্নেস্টো সোবেরন গুজম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে সম্পদ দখল করছে এবং নিজেদের আইন চাপিয়ে দিচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এমন কোনো ‘সর্বোচ্চ বিচারক’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে না, যার একক অধিকার রয়েছে অন্য দেশ আক্রমণ করা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে শাস্তি কার্যকর করার।
এই জরুরি অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্র মেক্সিকো ও ডেনমার্কও সমালোচনায় সরব হয়। মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হেক্টর ভাসকনসেলোস বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করা উচিত। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী সার্বভৌম জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ডেনমার্ক জানায়, বলপ্রয়োগ বা আন্তর্জাতিক আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ উপায়ে ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক ফলাফল প্রভাবিত করা কোনো রাষ্ট্রেরই উচিত নয়।
এ দিকে এনবিসি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনিজুয়েলায় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কোনো নির্বাচন হবে না। তিনি বলেন, দেশটাকে আগে ঠিক করতে হবে। মানুষের ভোট দেয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। প্রয়োজনে সাময়িকভাবে মার্কিন সেনা মোতায়েন করে ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কথাও বলেন তিনি। তবে একই সাথে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার সাথে যুদ্ধে নেই; বরং মাদক চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
ট্রাম্প আরো জানান, ভেনিজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র তেল কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দিতে পারে। তার মতে, এই কাজ ১৮ মাসের কম সময়ের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভেনিজুয়েলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা পরিচালনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখবেন। কে শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন- এই প্রশ্নে ট্রাম্প এক শব্দে বলেন, ‘আমি’।
অন্য দিকে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন আদালতে হাজির হয়ে নিজেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট বলেই দাবি করেন নিকোলাস মাদুরো। তিনি বলেন, আমি নির্দোষ। আমাকে কারাকাসে আমার বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছে। আমাকে অপহরণ করা হয়েছে। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো নিজেকে ‘যুদ্ধবন্দী’ হিসেবেও উল্লেখ করেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কোকেন পাচারকারী একটি নেটওয়ার্ক তত্ত্বাবধান করেছেন, যারা মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জেটাস কার্টেল, কলম্বিয়ার ফার্ক বিদ্রোহী এবং ভেনিজুয়েলার ট্রেন ডি আরাগুয়া গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত ছিল। মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ষড়যন্ত্র করছে।
আদালতে ৪০ মিনিটের শুনানিতে মাদুরো ও তার স্ত্রী মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তারা জামিনের আবেদন করেননি, ফলে আপাতত তারা ফেডারেল হেফাজতেই থাকবেন। শুনানি চলাকালে মাদুরো শান্ত ও সংযত ছিলেন। এক পর্যায়ে দর্শক সারিতে থাকা এক ব্যক্তি চিৎকার করলে মাদুরো বলেন, ‘আমি একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন যুদ্ধবন্দী’। পরে ওই ব্যক্তিকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেয়া হয়।
এ দিকে ভেনিজুয়েলায় সোমবার একটি জরুরি আদেশ জারি করা হয়, যাতে মার্কিন হামলার সমর্থকদের তল্লাশি ও গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই অভিযানের বৈধতা ও তাৎপর্য নিয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। রাশিয়া, চীন ও ভেনিজুয়েলার বামপন্থী মিত্ররা এই অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।



