আলি জামশেদ নিকলী (কিশোরগঞ্জ)
শৈত্যপ্রবাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রার রেকর্ড দুই দিন ধরে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় অবস্থান করছে। তীব্র ঠাণ্ডায় কাঁপছে হাওরাঞ্চল জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও খেটে খাওয়া মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও। নিকলী উপজেলা সদর হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগী প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য মতে, গত রোববার নিকলীতে দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গতকাল সোমবার তা সামান্য বেড়ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। তবে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীতের তীব্রতা কমেনি। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরো অন্তত এক থেকে দুই দিন এ পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে।
হাওরাঞ্চলে বাড়তি ভোগান্তিÍ : সরেজমিনে নিকলীর বিভিন্ন হাওর ও গ্রাম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কনকনে ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। চায়ের দোকানগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করছেন শ্রমজীবী মানুষ। হাওরের বুকে বোরো ধানের চারা রোপণে নিয়োজিত শ্রমিকদের অনেকেই ঠাণ্ডা, জ্বর ও সর্দিকাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
দামপাড়ার আরজ আলী সর্দার, ওয়াকিল মিয়া ও আল আমিনসহ একাধিক শ্রমিক বলেন, ঠাণ্ডার কারণে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শরীর কাঁপে, হাত-পা অবশ হয়ে আসে। তবুও পেটের দায়ে কাজে নামতে হচ্ছে।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদে ঝুঁকি : হাওরের সবজি চাষিরা জানান, এই তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হলে ফুলদায়ক ফসলের মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই বাড়লে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। একই সাথে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর মধ্যেও ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। স্থানীয় খামারিরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ : নিকলী উপজেলা সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: সজীব ঘোষ জানান, “সাম্প্রতিক সময়ে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, নেবুলাইজার ও কম্বলের ব্যবস্থা রয়েছে।”
কেন নিকলীতে বেশি ঠাণ্ডা : নিকলী উপজেলার সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক বলেন, “নিকলী নদী ও স্থলভাগের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় এখানে দ্রুত তাপমাত্রা পরিবর্তন হয়। আশপাশের অঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় নিকলীতে দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে। এই অবস্থা আরো কয়েক দিন থাকতে পারে।”
প্রশাসনের প্রস্তুতি : জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, কিশোরগঞ্জ জেলায় এ পর্যন্ত ২২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। নিকলীতে প্রয়োজন হলে আরো অতিরিক্ত কম্বল বিতরণ করা হবে। তিনি উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথাও জানান।
সারা দেশে শীতের দাপট
নিকলীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলও তীব্র শীতের কবলে পড়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় ঘন কুয়াশা : চুয়াডাঙ্গায় গত দুই দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। ঘন কুয়াশা ও বাতাসের কারণে বেড়েছে সর্দি, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগী। সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছে।
দিনাজপুরে হাঁড় কাঁপানো শীত : দিনাজপুরে তাপমাত্রা ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত। ছিন্নমূল মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।
আবহাওয়া অধিদফতরের সতর্কতা : আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সারা দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। এতে সড়ক, নৌ ও বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।
শৈত্যপ্রবাহের ঘোষণা না থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে নিকলীসহ হাওরাঞ্চলে শীত কার্যত দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। নি¤œ আয়ের মানুষ, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের দুর্ভোগ বেড়েছে।



