বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তির অপব্যবহার যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের কনটেন্ট ক্রিয়েটর আয়েশা তাহিরের সাম্প্রতিক অভিযোগ। গত বৃহস্পতিবার নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এক দীর্ঘ পোস্টে আয়েশা দাবি করেন, পাকিস্তানের জনপ্রিয় পোশাক ব্র্যান্ড ‘ইঞ্জিন’ তাদের সর্বশেষ কালেকশনের প্রচারণায় অনুমতি ছাড়াই তার মুখাবয়ব বা আদল ব্যবহার করে ‘এআই’-জেনারেটেড বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে। আয়েশা জানান, তিনি অতীতে এই ব্র্যান্ডের হয়ে মডেলিং করেছিলেন ঠিকই; কিন্তু বর্তমান সংগ্রহের কোনো প্রচারণার সাথেই তিনি যুক্ত ছিলেন না এবং তার ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি এভাবে ব্যবহারের কোনো অনুমতিও তিনি দেননি।
আয়েশা তাহিরের ভাষ্যমতে- বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে ব্র্যান্ড কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি সবার সামনে নিয়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, কোনো ব্যক্তির মুখ বা অবয়বের ‘এআই’ মাধ্যমে তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কনটেন্টটি বাস্তব হোক কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি ব্যক্তির ‘সম্মতি’ বা কনসেন্ট সবসময় সবার আগে থাকা উচিত। বিশেষ করে এই ভিজ্যুয়ালগুলো যখন জনসমক্ষে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়, তখন তা মডেল বা ক্রিয়েটরদের পেশাগত অধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
ওই ঘটনার সবচেয়ে ভীতিজনক দিকটি আয়েশা তার ফলোআপ স্টোরিতে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিজ্ঞাপনগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে, তিনি নিজেও প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো অতীতে করা কোনো শুটের এক-দু’টি পোশাকের ছবি এগুলো, যা তিনি ভুলে গেছেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে প্রায় প্রতিটি পোশাকেই তার মুখ বসানো হয়েছে, তখন তিনি বুঝতে পারেন এটি একটি সুপরিকল্পিত জালিয়াতি। আয়েশা ধারণা করছেন, ব্র্যান্ডটি হয়তো অন্য কোনো মডেলের মাধ্যমে ‘ফেসলেস’ বা মুখহীন শুট করিয়ে পরবর্তীতে ‘এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখানে তার মুখ বসিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল তার ছবির চুরি নয়; বরং অন্য একজন মডেলের শ্রমকেও অবমাননা করার শামিল। আয়েশার এই সাহসী প্রতিবাদের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। মিস ইউনিভার্স পাকিস্তান এরিকা রবিন, জনপ্রিয় অভিনেত্রী রোমাইসা খান এবং আরজে সাবাহ বানো মালিকের মতো তারকারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বিষয়টিকে ‘চুরি’, ‘অনৈতিক’ এবং ‘অপরাধমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি জনপ্রিয় অভিনেত্রী হানিয়া আমিরও আয়েশার এই প্রতিবাদ শেয়ার করে ব্র্যান্ডটিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। যদিও ‘ইঞ্জিন’ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে আয়েশার পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পরপরই তারা তাদের ওয়েবসাইট থেকে বিতর্কিত ছবিগুলো সরিয়ে নিয়েছে।
এই ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশ্বের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। এর আগে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এর ‘এআই’ টুল ‘গ্রোক’ নিয়েও একই ধরনের শরীর-বিকৃতি বা বডি-মর্ফিংয়ের অভিযোগ উঠেছিল। আয়েশা তাহিরের এই মামলাটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পেশাগত অধিকার রক্ষার আইনগুলো আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে শিল্পীদের আইনি ও নৈতিক অধিকার খর্ব করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আয়েশা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সমস্যাটি ‘এআই’ প্রযুক্তির ক্ষমতায় নয়; বরং মানুষের ‘ইচ্ছাকৃত ও অবৈধ’ অপব্যবহারে।



