নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নামাজে জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে দেশটির কোম নগরে গতকাল বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তাসনিম নিউজ লিখেছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ৬টায় জামকারান মসজিদে নামাজে জানাজার মধ্য দিয়ে শোকযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। নামাজে জানাজা পরিচালনা করেন প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাভাদি আমোলি।
তাসনিম লিখেছে, আকাশ থেকে তোলা ছবিতে কোম নগরীর এই বিদায় ও জানাজা অনুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে তুরস্ক, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো দেশ থেকে আসা মুসলিম প্রতিনিধিদলও রয়েছে। এর আগে সোমবার রাজধানী তেহরানে হয় প্রধান শোকযাত্রা; সেখানে ভোর থেকেই বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার শুরুতে নিজ বাসভবনে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য। মার্চে জানাজার আয়োজনের পরিকল্পনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ চলতে থাকায় তা স্থগিত করা হয়। গত শুক্রবার ইরানজুড়ে শুরু হয় খামেনিকে শেষ বিদায়ের সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা। এর অংশ হিসেবে আজ বুধবার খামেনির কফিন নেয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানকার নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজা হবে। ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন সেখানে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রার পর হজরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। তাসনিম নিউজ লিখেছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর দিন শুক্রবার বিভিন্ন দেশের নেতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এর পরের দুই দিন তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মুসাল্লায় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ। সেখানে কুরআন তিলাওয়াত, শোকগাথা আর প্রতিশোধের অঙ্গীকারে ইরানিদের অবিচল লড়াইয়ের সংকল্প ফুটে ওঠে। এর মধ্যে রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কলিবফের উপস্থিতিতে খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা হয়।
জানাজায় আহমাদিনেজাদ
চলতি যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে নিহত হয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া খবরকে মিথ্যা প্রমাণ করে খামেনির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠানে আকস্মিকভাবে উপস্থিত হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তেহরানের রাস্তায় কালো পোশাক পরিহিত লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের সাথে তাকে সশরীরে শামিল হতে দেখা গেছে। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের শাসনভার পরিচালনাকারী কট্টরপন্থী এই সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানকে যুদ্ধের প্রথম দিনেই মৃত বলে ঘোষণা করেছিল ইরানের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম।
ওই দিন ইসরাইল ও আমেরিকার চালানো একযোগে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হন এবং আহমাদিনেজাদের বাসভবনের কাছেও একটি রকেট আঘাত হানায় তার মৃত্যুর বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হামলার পর দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তিনি সম্পূর্ণ জনসমক্ষেই ছিলেন না এবং তার কোনো বিবৃতিও কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এমনকি তেহরানের সরকারি কোনো দফতর থেকেও তার জীবিত বা মৃত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত বা অস্বীকার করা হয়নি, যা যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর এক বড় কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্য হিসেবে রয়ে গিয়েছিল।
গত সোমবার তেহরানের রাজপথে খামেনির কফিনযাত্রার মিছিলে একটি সাধারণ জ্যাকেট পরিহিত এবং থুতনিতে মাস্ক নামানো অবস্থায় প্রথমবারের মতো সবার সামনে আসেন এই সাবেক নেতা। ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই জানাজার জনসমুদ্রে দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিকেও সাধারণ মানুষের সাথে শামিল হতে দেখা গেছে, যিনি প্রবল ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে হুঁশিয়ারি
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি বলেন, হুমকি অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় লাখ লাখ ইরানি সমবেত হচ্ছেন। কোনো হুমকিতে তারা বা আমাদের সশস্ত্র বাহিনী- কেউই পিছু হটবে না। আপনারা আপনাদের স্বাক্ষরকে সম্মান করুন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, অথবা ‘তাদের শেষ করে দেবে’। সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের সেতুগুলো ভেঙে ফেলতে পারি। আমরা তাদের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারি। তাদের কাছে এখন কোনো টাকা নেই। আমরা তাদের কোনো টাকা দিইনি।’
তবে খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে হামলা চালিয়েছে ইরান। সোমবার মধ্যরাতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এ হামলা চালিয়েছে। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে গতকাল মঙ্গলবার এক্সিওসের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, হামলায় দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি। সোমবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি রেকর্ডিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড সামুদ্রিক রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, ‘নির্দেশনা অমান্য করলে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আপনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে প্রস্তুত।’
আক্রমণের শিকার হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে একটি হলো নাকিলাতের মালিকানাধীন ও পরিচালিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার আল রেকায়াত। এটি কাতারের এলএনজি শিল্পের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। প্রজেক্টাইলটি জাহাজটির বাম পাশে ইঞ্জিন রুমের ওপরের অংশে আঘাত হেনেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হামলার ফলে ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগেছে এবং চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না। জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদে জাহাজের ডান পাশে একত্রিত হয়েছেন। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সাখে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান প্রণালীটিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এরই মধ্যে উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত পথ ব্যবহার না করা জাহাজগুলোকে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে তেহরান।



