আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটসংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়া ব্যক্তির একক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি মজবুত করে একক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে সিলেট নগরীর বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় আয়োজিত গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, একজন ব্যক্তি সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সংবিধানকে নিজের ইচ্ছামতো বারবার সংশোধন করেছিল। অবৈধ ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে সংবিধানকে ব্যবহার ও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে চিরতরে বিলুপ্ত করতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অন্তর্বর্তী সরকারের একক এজেন্ডা নয়। এটি সব রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ ৯ মাসের বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে অর্জিত ঐকমত্যের সনদ। এ সনদ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন দেয়া হাজার হাজার ছাত্র-জনতার রক্তের ঋণ শোধ করা হবে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে কোথাও উল্লেখ নেই যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা গণভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারণার নজির রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা নির্দ্বিধায় প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হলে মুক্তিযুদ্ধ মুছে দেয়া হবে এবং সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ তুলে দেয়া হবে, এমন গুজব ছড়িয়ে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে। যে লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সে লক্ষ্য ৫৪ বছরেও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। তাই জুলাই সনদ মূলত ’৭১-এর চেতনাকে সমুন্নত রাখার সনদ। এ সময় তিনি অনেক প্রাণ, রক্ত, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিনিময়ে পাওয়া এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মনির হায়দার বলেন, আপনাকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে- হয় ‘হ্যাঁ’ নয় ‘না’। এই স্বাধীনতা আপনার আছে। তবে বুঝতে হবে কোন পক্ষ বেছে নিলে দেশ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাবে কিংবা মৌলিক অধিকারের দাবিতে আবারো কোনো মায়ের বুক খালি হবে না। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। ফ্যাসিবাদ ফিরে এলে আবারো সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার নৈতিক দায়িত্ব হলো গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় নিশ্চিত করা।
বিভাগীয় কমিশনার খান মো: রেজা-উন-নবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ধর্মসচিব মো: কামাল উদ্দিন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো: মুশফেকুর রহমান, পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ। সভায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সরকারি দফতরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, এনজিও প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ইমামদের ভূমিকা রাখতে হবে
এ দিকে, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোটসংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, সমাজে ইমামদের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। ন্যায়ভিত্তিক, সমতাপূর্ণ ও মানবিক মর্যাদার সমাজ গঠনে ইমামদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সিলেট নগরীর বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে আয়োজিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মনির হায়দার বলেন, এক সময় দাড়ি, টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত আলেমদের দেখলেই জঙ্গি আখ্যা দেয়া হতো। তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে ভয় পেতেন। একসাথে চার-পাঁচজন মিলে হাঁটতে পারতেন না, চায়ের দোকানে বসতে পারতেন না। এমনকি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত চলচ্চিত্রেও দাড়ি-টুপি পরিহিতদের স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের সেই নির্যাতন ও নিপীড়ন থে১কে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমাদের সন্তানরাই মুক্তি এনে দিয়েছে। এই ফ্যাসিবাদ চিরতরে নির্মূল করতে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করা আমাদের সবার ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব।
কমিশনার খান মো: রেজা-উন-নবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ধর্মসচিব মো: কামাল উদ্দিন, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো: মুশফেকুর রহমান, পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান এবং সিলেট জেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব। সভায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইমামগণ, সরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



