নয়া দিগন্ত ডেস্ক
তিন মাসের যুদ্ধ, ছয় সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং অসংখ্য দফা পরোক্ষ আলোচনার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গতকাল সোমবার তেহরান ও ওয়াশিংটন- উভয়পক্ষই কার্যত একসুরে বলেছে, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর আসন্ন নয়। এর মাঝে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে বেইজিং সফর করেছেন, আর ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিয়েছেন- শত্রুর ‘অতিরিক্ত দাবি’র কাছে মাথা নত করবে না ইরান।
অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে তিনি মার্কিন আলোচকদের ‘তাড়াহুড়া না করার’ নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তারা একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
‘অনেক বিষয়ে ঐকমত্য, তবু চুক্তি দূরে’
তেহরানে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেঈ বলেন, ‘আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি বড় অংশে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। এটি সত্য। কিন্তু এর মানে এই নয় যে চুক্তি স্বাক্ষর আসন্ন- এমন দাবি কেউ করতে পারবেন না।’
বাঘেঈ জানান, সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকটিতে ১৪টি বিষয় রয়েছে এবং এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো যুদ্ধের অবসান ও হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। বিনিময়ে ইরান প্রণালীতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেবে। পারমাণবিক ইস্যু এই পর্যায়ের আলোচনায় নেই- সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হলে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়সহ অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যু আলোচনায় আসবে।
হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বাঘেঈ বলেন, এটি উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের অংশ। ইরান ও ওমান যৌথভাবে একটি নিরাপদ নৌচলাচল প্রোটোকল তৈরি করছে। তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান কোনো ‘টোল’ আদায় করছে না। তবে নৌ চলাচল নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার মতো সেবায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু ব্যয় জড়িত। ওমানের বিপরীত তীরসংলগ্ন এই প্রণালীর ব্যবস্থাপনায় ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি গত রোববার মাসকাট সফর করেছেন।
বাঘেঈ আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ‘বিশৃঙ্খল’ হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার ব্যবধানে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়া যেকোনো আলোচনাকে জটিল করে তোলে। মন্ত্রণালয়ের পদত্যাগের ঢেউ, কংগ্রেসের বিরোধিতা ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব- এ পরিস্থিতি ইসরাইলসহ কিছু বিশেষ পক্ষকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিচ্ছে। এ দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মার্কিন ভিসাজনিত জটিলতা ও সার্বিক পরিস্থিতির কারণে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন।
‘ভালো চুক্তি নইলে কোনো চুক্তি নয়’
নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সামনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া এবং পারমাণবিক বিষয়ে সময়সীমাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্রে ‘বেশ শক্ত একটি প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম গতকাল (রোববার) রাতেই কিছু একটা ঘোষণা হবে। হয়তো আজকেই।’ সাথে সতর্ক করে বলেন, ইরানের কাছ থেকে সাড়া পেতে একটু সময় লাগে।
রুবিও জোর দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘কখনো খারাপ চুক্তি করবেন না।’ কূটনীতিকে পূর্ণ সুযোগ দেয়া হবে, কিন্তু তাতে কাজ না হলে ‘বিকল্প পথে’ মোকাবেলা করা হবে।
ট্রাম্প গতকাল সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, চুক্তি হবে ‘মহান ও অর্থবহ’, নইলে আদৌ কোনো চুক্তি হবে না। এর আগে গত রোববার তিনি বলেছিলেন, আলোচনায় ‘অনেকটাই মীমাংসা হয়ে গেছে’। কিন্তু পরদিনই অবস্থান পাল্টে জানান, আলোচকদের ‘তাড়াহুড়া না করতে’ নির্দেশ দিয়েছেন এবং ‘উভয়পক্ষকেই সময় নিয়ে সঠিক কাজ করতে হবে।’
সিবিএস নিউজ ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি- যিনি যুদ্ধের প্রথম দিনে ইসরাইলি হামলায় আহত হয়েছিলেন এবং তার বাবা ও পূর্বসূরি সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন- এখন অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন। এতে তার দূতদের সাথে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে, যা আলোচনার গতিকে ধীর করে দিচ্ছে।
পাকিস্তান-চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা
পাকিস্তানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে বেইজিং সফর করেছেন। শরিফ চীনা নেতাদের সাথে বৈঠকে বলেন, ‘বিশ্ব এখন একটি সঙ্কটময় মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তবে বিষয়গুলো সঠিক দিকে এগোচ্ছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীনের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।’ মুনির গত সপ্তাহে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির সাথে তেহরান সফর করেছিলেন। চীন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানের সাথে একযোগে কাজ করবে তারা।
বাঘেঈ স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক অগ্রগতি মূলত পাকিস্তান ও আরো কয়েকটি দেশের কয়েক সপ্তাহব্যাপী মধ্যস্থতার ফল।
ইসরাইলের ভূমিকা ও বিশেষজ্ঞ মত
বাঘেঈ সতর্ক করে দেন, ইসরাইল আলোচনা নষ্ট করার সব রকম চেষ্টা চালাবে। ‘দেশটি যেকোনো উত্তেজনা হ্রাসের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে সর্বোচ্চ সক্রিয়। ইসরাইল কী করতে পারে- কিছুই বাতিল করা যায় না।’ তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই কিছু যুদ্ধবাদী গোষ্ঠীর সাথে ইসরাইলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যারা বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে।
রোমের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া দেসি আলজাজিরাকে বলেন, আলোচনা এখনো ‘তরল’ এবং কোনো বড় অগ্রগতির কাছাকাছি নয়। তবে উভয়পক্ষের অবস্থান কিছুটা ‘নমনীয়’ হচ্ছে। বিশেষত ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাবের মতো দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার ইস্যুগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে কিছু বিষয় আলাদা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো বিপদমুক্ত নই। মধ্যস্থতাকারীদের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।’
পেজেশকিয়ানের বার্তা : আত্মসমর্পণ নয়
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল সোমবার বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বারের সদস্যদের সাথে বৈঠকে বলেন, সামরিক ব্যর্থতার পর শত্রুপক্ষ এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধে মনোযোগ দিয়েছে। তবে সরকার ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করলে এই পর্যায়ও অতিক্রম করা সম্ভব। এক্সে দেয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ইরান সবসময় তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে এবং যুদ্ধ এড়াতে সম্ভাব্য সব পথ খোলা রেখেছে। জোর করে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো নিছক বিভ্রম। কূটনীতিতে পারস্পরিক সম্মান- যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি বিচক্ষণ, নিরাপদ ও টেকসই।’
সার্বিক পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট- চুক্তির রূপরেখা কাগজে আছে, ইচ্ছাও আছে দু’পক্ষের, কিন্তু আস্থার ঘাটতি, ইসরাইলের অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ বিভেদ মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো নাজুক। হরমুজ প্রণালীতে এক-পঞ্চমাংশ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আটকে থাকার সাথে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যে এই আলোচনার ফলাফলের সাথে সরাসরি বাধা- সেটি দু’পক্ষই জানে।



