নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ‘রাজনৈতিক জোকার’ বা ‘পলিটিক্যাল ক্লাউন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপনকালে বলেছে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের দায়িত্বজ্ঞানহীন, উসকানিমূলক ও হাস্যকর বক্তব্যের কারণেই দলটির নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজপথে উসকে উঠে দেশজুড়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
টানা ছয় কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের শীর্ষ নেতাসহ পলাতক সাত আসামিরই সর্বোচ্চ সাজা (মৃত্যুদণ্ড) দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। প্রসিকিউশনের যুক্তি শেষ হওয়ার পর বিচারিক প্যানেলে পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী এম হাসান ইমাম তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, নিজেদের প্রথম শ্রেণীর এবং দেশের বাকি জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভাবতো। এমনকি নিজস্ব স্বার্থে আঘাত লাগলে নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদেরও তারা ছাড় দিত না, যার অন্যতম প্রমাণ টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম হত্যা।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে ওবায়দুল কাদের ছিলেন একজন পলিটিক্যাল ক্লাউন বা টিকটকার। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার কোনো গাম্ভীর্য ছিল না। টিকটকাররা তার উসকানিমূলক কথা ব্যবহার করে কন্টেন্ট বানাত। তার এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড ও উসকানির কারণেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।’ ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
আসামিদের ‘দুর্বৃত্তপরায়ণ ও দুষ্কৃতকারী’ আখ্যা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছদ্মাবরণে তারা প্রত্যেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দায় ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ (উচ্চতর আদেশের দায়) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন দুষ্কৃতকারী রাজনীতিবিদ আর জন্ম না নেয়, সে জন্য তাদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।’
যুক্তিতর্ক চলাকালে আন্দোলনের সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশীদ ও ওবায়দুল কাদেরের মধ্যকার একটি বিস্ফোরক ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। কোটা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে খাবার খাওয়ানো এবং সেই ছবি প্রকাশ্যে আনা নিয়ে তৎকালীন শীর্ষ মহলের ভেতরের ক্ষোভ ও টানাপোড়েন উঠে এসেছে এই ফোনালাপে।
প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানায়, আসামিরা জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানি দিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতায় প্ররোচনা সংক্রান্ত ফোনালাপটি বিচারিক প্যানেলে দাখিল করা হয়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এই সাত পলাতক আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। তার আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনীত ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) আমলে নেয়া হয়েছিল। গত ২ আগস্ট এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয় (যার মধ্যে ২৮ জন সরাসরি ট্রাইব্যুনালে এসে জবানবন্দী দেন এবং শহীদ শরিফ ওসমান হাদির সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়)।
ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত ওবায়দুল কাদের ও ডিবির হারুনের কথোপকথন (হুবহু)
কাদের : হ্যালো?
হারুন : হ্যালো। স্যার আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
কাদের : ইয়া হারুন কি তুমি এত... নেত্রীও তো বিরক্ত হইছে।
হারুন: স্যার, নেত্রীরে...
কাদের : আমি তো তোমারে প্রতিদিন বলতে ছিলাম তুমি ভালো করতেছো।
হারুন : স্যার, স্যার, আমি... আমি...
কাদের : ভালো করতে করতে আবার খাওয়াই ওই ছবি কেন তুললা।
হারুন : না না এ খাওয়ার ডিসিশনটা কে দিয়েছে স্যার? আমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমার এসবির চিফ এরা দিছে খাওয়ার নেয়ার জন্য। খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তো আমি নেই নাই।
কাদের : না না, উনি তো বলছে যে তোমাকে ছবি তুলে বাইরে পাঠাইতে বলছে?
হারুন : স্যার, জি স্যার। ছবি তোলা প্লাস হইলো যে বিবৃতিটা প্রকাশ করা...
কাদের : ছবিটা নিজের কাছে রাইখা দিতা, এইটা তো...
হারুন : না না, উনারা তো বলছে প্রকাশ করার জন্য, স্যার। মনির স্যার এসবি চিফ স্যারে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার। মনির স্যার বলছে কি না।
কাদের : কিন্তু প্রধান... প্রধানমন্ত্রী তো যখন এগুলো বলতে ছিলেন।
হারুন : জি স্যার।
কাদের : তখন তো হোম মিনিস্টারও ওখানে ছিল।
হারুন : স্যার, অহন যদি উনারা শেল্টার না দেয় আমারে... অহন হোম মিনিস্টার, প্রধানমন্ত্রী বলতেছে হোম মিনিস্টার কোনো নির্দেশ দেয় নাই, হোম মিনিস্টার অহন আমারে বদলি করছে...
কাদের : উনি তো ডিফেন্ড করছে ওরে।
হারুন : হ্যাঁ?
কাদের : উল্টো তো তুমি দোষারোপ হচ্ছো।
হারুন : স্যার, হোম মিনিস্টার বলছে, পিএম... পিএম নাকি বলছে...
কাদের : আর ওদেরকে কী করলা?
হারুন : কোনটা?
কাদের : ওই ছয়জন?
হারুন : ছয়জন তো স্যার... এটা স্যার... স্যার, প্রতিদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় মিটিং হয়, প্রতিদিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় মিটিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখান থেকে যা নির্দেশ দেয়, সেটাই আমি করি। যা নির্দেশ দেয়, সেটাই আমি করি। একজন ডিবি প্রধান কি করবে স্যার?
কাদের : আমি বলছি যে, ওই তুমি যাদেরকে ওখানে হেফাজতে রাখছো।
হারুন : জি?
কাদের : তাদের সেইফ কী?
হারুন : স্যার, এটা তো... এটা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার ওইহানের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত যা দেয়, তাই করি। একা ডিবিপ্রধান কত... কতটুকু করবে না তো... করবে না তো স্যার।
কাদের : তো এরা ওখানেই আছে?
হারুন : অইখানেই আছে, স্যার। উনারা যা বলবে, সেটাই হবে, স্যার।
কাদের : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না... সেটা তো...
হারুন : স্যার, এখন... এখন, স্যার, এখন আমি যেটা বলি, স্যার। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমারে কমিশনাররে বলে দিছে আমার বদলি করা লাগে। তা আমি... আমার বদলি করে দিচ্ছে, স্যার। আমার অপরাধটা কী, স্যার? আমার অপরাধ কী, স্যার?
কাদের : না, অয় তো নেত্রী যে নির্দেশ দিছে, সেখানে তো ‘হি ওয়াজ নট ডিফেন্ডিং ইউ’।
হারুন : হুম।
কাদের : সে তো এমনভাবে দেখা দিছে যে তুমি নিজেও...
হারুন : স্যার, এরা এত বড় একটা...
কাদের : এসব ছবি তো তুমি নিজেই করো।
হারুন : জি?
কাদের : নিজে নিজে করো।
হারুন : আমি... স্যার, আমরা যা করছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপির নির্দেশে করছি। এর বাইরে একবিন্দু করি নাই। আপনি এর প্রমাণ নিয়েন।
কাদের : কিন্তু তারা তো এইটা এখন স্বীকার করে না।
হারুন : না, স্বীকার করে না... স্বীকার কেন করবে না? আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যে স্বীকার করে কিনা জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
কাদের : আচ্ছা, দেখি। দেখি আমি হোম মিনিস্টারের সাথে কথা বলি।
হারুন : স্যার, এটা যদি অহন স্যার না করেন, তাহলে কিন্তু অর্ডার অহন করে দিবে, স্যার। তা আমি... আমি নাই স্যার, ডিবিতে নাই স্যার। অর্ডার করে দিবে।
কাদের : ঠিক আছে।


