চীনা পণ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প

Printed Edition
চীনা পণ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প
চীনা পণ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প

শফিকুল আলম ভূঁইয়া রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষই দা, বঁটি, ছুরি কিংবা চাপাতি তৈরির জন্য কামারদের ওপরই নির্ভর করতেন। কামারশালায় আগুনে লাল করে গরম করা লোহায় হাতুড়ির ছন্দময় আঘাতে তৈরি হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও গৃহস্থালির এসব সরঞ্জাম। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা শব্দ ও দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। চীনা পণ্যের দাপট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রেতার রুচির পরিবর্তনের কারণে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার অনেক কামারশালায় এখন আগের মতো কাজের ব্যস্ততা নেই। দিনের বেশির ভাগ সময়ই অলস বসে থাকছেন কারিগররা। অনেকে ইতোমধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার কেউ কেউ দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কোনো রকমে চালিয়ে যাচ্ছেন কামারশালার কাজ। এতে তাদের জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রবীণ কামার হরি গোপাল বলেন, প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় জড়িত। তার বাবা ও দাদাও একই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আগে এলাকায় অনেক কামারশালা ছিল। এখন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ দেশীয় পণ্যের বদলে বিদেশী পণ্য, বিশেষ করে চীনা পণ্যের দিকে ঝুঁঁকছে।’

হরি গোপাল আরো জানান, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। আগে এক বস্তা কাঠকয়লা ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায়। লোহা ও ইস্পাতের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে দেশীয়ভাবে তৈরি করা কামারশালার দা, বঁটি বা ছুরির দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজারে প্রচলিত কম দামের চীনা পণ্যের সাথে আমাদের তৈরি করা পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

জয় মা কর্মশালার কারিগর নিরঞ্জন বলেন, ‘আগে ঈদের সময় অনেক দা, ছুরি বিক্রি হতো। এখন ঈদের উৎসবের মৌসুমেও ক্রেতারা তেমন আসে না। দাম একটু বেশি হওয়ায় সবাই চীনা পণ্য কিনছেন।’

কামার নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘এখন এ পেশার আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। সারা দিন দোকানে বসে থাকলেও কাজের অর্ডার আসে না। অনেক সময় অলস বসেই সারাটা দিন কাটাতে হয়।’

স্থানীয় কামারদের ধারণা, দেশীয় লোহার তৈরি সরঞ্জামের মান ভালো ও টেকসই হলেও; বিদেশী পণ্যের আকর্ষণীয় নকশা, কম দাম এবং ব্যাপক বাজারজাতকরণের কারণে ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁঁকছেন। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলা কামার সমিতির সভাপতি কালিপদ রায় বলেন, ‘একসময় রূপগঞ্জে অসংখ্য কামারশালা ছিল। এখন অধিকাংশই বিলুপ্তির পথে। তিনি ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে বিদেশী লৌহজাত পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে, দেশীয় কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রশিক্ষণসহ উন্নতমানের পণ্য তৈরিতে সরকারি সহায়তা কামনা করছেন।