জীবননগরে সেনা নির্যাতনে বিএনপি নেতার মৃত্যুতে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ

Printed Edition

জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে পৌর যুবদল নেতা শামসুজ্জামান ডাবলুকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সেনাবাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশের সাথে বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষে পুলিশ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। সোমবার রাত সাড়ে ১০ টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে।

নিহত যুবদল নেতা শামসুজ্জামান ডাবলু (৫৩) জীবননগর পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি জীবননগর হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ‘হাফিজা ফার্মেসি’র মালিক এবং বসতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

নিহতের ভাই মো: শরিফুল ইসলাম জীবননগর থানায় দায়ের করা এজাহারে অভিযোগ করেন, সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শামসুজ্জামান ডাবলু নিজ ফার্মেসিতে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেনসহ কয়েকজন সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে কোনো কারণ ছাড়াই তাকে ভয়ভীতি দেখান এবং জোরপূর্বক ফার্মেসি থেকে তুলে নিয়ে যান।

এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্তরা তাকে পার্শ্ববর্তী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ময়েন উদ্দিনের কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে চিৎকার বন্ধ করার অভিযোগও করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা কার্যালয়ের বাইরে থেকে তার আর্তচিৎকার শুনতে পান বলে দাবি করা হয়। পরে অভিযুক্তরা তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন।

নিহতের পরিবারের দাবি, ওই নির্যাতনের একপর্যায়ে শামসুজ্জামান ডাবলু মারা যান। তবে ঘটনাটি আড়াল করতে অভিযুক্তরা তাকে চিকিৎসার জন্য জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে বিক্ষুব্ধ জনতা জড়ো হয়। এ সময় উত্তেজিত তাদের ছোড়া ইটপাটকেলে জীবননগর থানার ওসি সোলায়মান শেখ ও পরিদর্শক (তদন্ত) রিপন কুমার দাসসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ময়না তদন্তের প্রস্তুতি চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এজাহার করা হয়েছে।

জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা একজন রাজনৈতিক নেতাকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা আমাদেরকে হতাশ করেছে। আমরা এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।

জীবননগর থানার সোলায়মান শেখ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনার ব্যাপারে এখনো মামলা হয়নি।

ক্যাম্প কমান্ডারসহ সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার করা হয়েছে : আইএসপিআর

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনা অভিযানে আটকের পর বিএনপি নেতার মৃত্যুর ঘটনায় সেখানকার ক্যাম্প কমান্ডারসহ সব সেনাসদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আইএসপিআর ‘চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে আটককৃত ব্যক্তির মৃত্যুবরণ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, গতকাল রাত ১১টার দিকে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য যৌথবাহিনী জীবননগরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-সংলগ্ন একটি ফার্মেসি থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মো: শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে (৫০) আটক করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আটক ব্যক্তির তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি করে একটি ৯ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে আটক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে আনুমানিক রাত ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ঘটনাটি অনাকাক্সিক্ষত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতোমধ্যে ওই ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনাসদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডাবলু হত্যায় সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ চায় বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিএনপি নেতা মো: শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সোমবার রাতে ডাবলুকে নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্য অস্ত্র উদ্ধারের নামে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এতে তার মৃত্যু হয়। এ অমানবিক ও পৈশাচিক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা মনে করি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত এ ধরনের ঘটনা দেশের জন্য শুভ নয়। বিচারবহির্ভূতভাবে শামসুজ্জামান ডাবলুকে নির্যাতন করে হত্যা করা দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি চরম অবমাননা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যেকোনো অপরাধের জন্য বিচারিক আদালতের মাধ্যমে দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।’

তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাকে (ডাবলুকে) ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা কখনোই দেশের মানুষের নিকট সমর্থনযোগ্য নয়। আমি এ ধরনের লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

তিনি এ পৈশাচিক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। সেই সাথে ডাবলুর রূহের মাগফিরাত কামনা এবং তার পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।