নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ততই বাড়ছে। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সর্বত্র এখন একটি আলোচনা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের নিয়ে। এবারের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে এমপি প্রার্থীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকার এক প্রাপ্ত থেকে অন্য প্রান্ত। তারা গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। সাধারণ ভোটাররাও মুখিয়ে আছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে।
জেলায় মোট আটটি আসনের মধ্যে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনকে বলা হয় কেন্দ্রীয় আসন। এ জন্য এই আসনে আলাদা নজর জেলাবাসীর। টাঙ্গাইলের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। এখানে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল। বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ে। অন্য দিকে কৌশলী অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। এ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা আমির আহসান হাবিব মাসুদ। এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বাড়তি সুযোগ নিতে পারে জামায়াত। তা ছাড়া মনোনয়ন দ্বন্দ্ব বিএনপিকে যেখানে কুরে কুরে খাচ্ছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রয়েছেন সম্পূর্ণ নির্ভার অবস্থায়। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। ঐতিহ্যগতভাবেই ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। এটাও তাদের নির্বাচনে টনিকের মতো কাজ করবে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটাররা।
টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রদানকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিভাজন এখন অনেকটাই স্পষ্ট। হাইকমান্ড থেকে দেশের অন্যান্য জেলার মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণার বেশ কিছু দিন পর টাঙ্গাইল-৫ আসনের মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং ফরহাদ ইকবাল তৃণমূলে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য জানান দিতে ও দলীয় মনোনয়ন পেতে পৃথকভাবে বিশাল শোডাউন করেন একাধিকবার। কেন্দ্র থেকে শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেয়া হয় সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর হাতে। এতে তার কর্মী-সমর্থকরা আনন্দ উল্লাস করলেও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন ফরহাদ ইকবালের পক্ষের লোকজন।
ফরহাদ ইকবাল ও তার কর্মী-সমর্থকরা দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে নামেন। টুকুকে মনোনয়ন দেয়ায় টাঙ্গাইল সদরে বিএনপির মৃত্যু হয়েছে বলে কফিন মিছিল বের করেন তারা। এ নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনার ঝড় উঠে। ফরহাদ ইকবাল দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে এখনো মাঠে সরব রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েই ভোটের মাঠে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শত ভাগ আশাবাদী দুইজনেই।
অন্য দিকে জনগণের আস্থা নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে জামায়াতে ইসলামী জোটগত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৌশলে এগুচ্ছে জামায়াত। প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপি কালক্ষেপণ করলেও একক প্রার্থী নিয়ে জামায়াত অনেক আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে এ আসনে জয়ের বিকল্প দেখছে না জামায়াতে ইসলামী।
জানা যায়, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে ১৪ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেন ১১ জন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে মোট ছয়জনের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তারা হলেন- জামায়াতের আহসান হাবিব মাসুদ, বিএনপির সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সৈয়দ খালেকুজ্জামান মোস্তফা, জাতীয় পার্টির মোজাম্মেল হক ও গণঅধিকার পরিষদের শফিকুল ইসলাম। অন্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হলে তারা আপিল করেন।
তবে অন্য দলগুলোর প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রার্থী হলেও ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জামায়াতের আহসান হাবিব মাসুদ, বিএনপির সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল। আর বিএনপির মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর দুই গ্রুপের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বই জামায়াতের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফরহাদ ইকবাল নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে পাল্টে যেতে পারে এই আসনের হিসাব-নিকাশ। সে ক্ষেত্রে এখানে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ফরহাদ ইকবাল ও আহসান হাবিব মাসুদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই তিন প্রার্থীই সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসনে নতুন মুখ। তবে শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে কে বিজয়ী হন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী দলের জেলা আমির আহসান হাবিব মাসুদ বলেন, কোন দল কী করল, না করল সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা আমাদের মতো কাজ করছি, জনগণের কাছে যাচ্ছি। আমরা মাঠে-ময়দানে ভোটারদের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছি।
টাঙ্গাইল-৫ আসনের নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বলতে বিএনপির প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এ অবস্থায় জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও একশ’ ভাগ নিশ্চিত আমরাই জিতব। মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও ধানের শীষের পক্ষের ভোট ধানের শীষেই যাবে। জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরাও জনগণের কাছে যাচ্ছি, তারাও যাচ্ছে। এখন জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কাকে ভোট দিবে, কাকে তারা সংসদে চায়। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল বলেন, আমি জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি এবং জনগণের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব। এই আসনে বিএনপি থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তিনি এখানকার স্থানীয় না হওয়ায় জনগণ তাকে গ্রহণ করছে না। তিনি এর আগে টাঙ্গাইল-২ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। আশা করছি, বিএনপির হাইকমান্ড দলীয় স্বার্থে এ আসনের মনোনয়ন পরিবর্তন করে ধানের শীষ আমার হাতেই তুলে দিবে।



