বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় পরীক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

দেশজুড়ে টানা ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল সোমবারের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে উঠলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কোমরসমান পানি, নৌকা কিংবা ভ্যানে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে বহু পরীক্ষার্থীকে। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোনো এলাকায় পরীক্ষা স্থগিতের প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড ও আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই প্রশ্নপত্রে দেশব্যাপী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিচ্ছিন্নভাবে কোনো বোর্ড বা কেন্দ্রের পরীক্ষা স্থগিত করা সহজ নয়। তবে দুর্যোগের তীব্রতার কারণে আগে থেকেই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১৬ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারিত সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অন্য আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং শিক্ষা বোর্ড, জেলা প্রশাসক এবং আবহাওয়া অধিদফতরের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে শুরু করে। অনেক স্থানে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অভিভাবকদের অনেককেই সন্তানদের নিয়ে দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে হেঁটে কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা যায়।

সবচেয়ে দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায়।

নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি ঢুকে পড়ে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতায় শত শত পরিবার আটকা পড়ায় পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান।

কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো: কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলার দু’টি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পানি বেশি থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না।

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বসে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্র এবং আশপাশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন পাঠায়। তারা যদি পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয় বলে মত দেয়, তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি বলেন, শুধু পরীক্ষাকেন্দ্র নয়, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হয়। তবে পরীক্ষা পেছালে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বর্ষাকাল এড়িয়ে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে বর্ষাকালজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজধানীর উত্তরার এক পরীক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেয়া যৌক্তিক নয়। পুরান ঢাকার আরেক পরীক্ষার্থী লিখেছেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের অনেক জেলাতেই একই অবস্থা। তাই সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা অন্তত এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া উচিত।

অভিভাবকদের মধ্যেও ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে। সরকারি বিজ্ঞান কলেজের এক পরীক্ষার্থীর মা রেহানা খাতুন বলেন, আইসিটি পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে তার ছেলে বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এরপরও তাকে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের আরো মানবিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে এক দিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে চট্টগ্রামে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে, তবে সপ্তাহজুড়ে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

পরীক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষার সূচি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কোমর বা হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্যোগের মধ্যে এক অঞ্চলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া এবং অন্য অঞ্চলে তা স্থগিত থাকার ফলে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না। বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই বিকল্প পরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল।

তার মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমতা নিশ্চিত করেই পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা করা উচিত।