ঝালকাঠি প্রতিনিধি
বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ১২ জন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১১০ জন। অথচ সরেজমিন দেখা যায় বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকেও উপস্থিত নেই। শ্রেণিকক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাগল। বেঞ্চে শুয়ে ঘুমাচ্ছে ছাগল। আরও দেখা গেল বেঞ্চের ওর ছাগলের মলমূত্র, কাদা-ময়লা ও আবর্জনা। স্কুলের দেয়ালে ও বোর্ডে জমেছে মাকড়সার জাল। এমন চিত্র ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের।
সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক ও অফিসকক্ষে তালা। বাইরে জাতীয় পতাকা টাঙানো থাকলেও বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই। শ্রেণিকক্ষগুলো অপরিচ্ছন্ন। বেঞ্চগুলো এলোমেলো পড়ে আছে। একটি হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের লেখার চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চলতি বছরে এ বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হয়নি।
এ সময় সহকারী শিক্ষক অনামিকা ও রতন লাল বিদ্যালয়ে আসেন। পরে প্রায় দুপুর ১২টার দিকে প্রধান শিক্ষক মো: আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো: হাসান মৃধাও আসেন। তবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখা যায়নি। হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে সেটিও দেখাতে পারেননি তারা। শিক্ষকরা জানান, খাতাটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের বাড়িতে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন শিক্ষকরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষকের পক্ষ থেকে প্রতিবেদককে টাকা দেয়ারও চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির এমন অবস্থা। স্থানীয় কোনো ছেলেমেয়ে সেখানে পড়তে আসে না। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়বিমুখ শিশু-কিশোরদের কাগজে-কলমে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। অডিট, অনুষ্ঠান বা পরীক্ষার সময় ঝালকাঠি শহর থেকে অটোরিকশায় করে শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার বলেন, ২০০৬ সালের দিকে সভাপতি হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, বিদ্যালয়ে বাস্তবে কোনো শিক্ষার্থীই নেই। তার ভাষ্য, একদিন হঠাৎ বিদ্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ পান। সিডরে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেখিয়ে তার স্বাক্ষর জাল করে ৫০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান নেওয়ার ঘটনাও তিনি জানতে পারেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন। আরেক সাবেক সভাপতি ও রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকাকালে তিনিও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী না থাকার বিষয়টি দেখতে পান। নিয়মিত ক্লাস ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার উদ্যোগ নিলেও সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি ২০১৫ সালে পদত্যাগ করেন।
বর্তমান সভাপতি মো: মিজানুর রহমান পারভেজ অভিযোগগুলো অস্বীকার না করে বলেন, ‘এসব বিষয়ে তিনি প্রতিবেদকের কাছে জবাব দিতে বাধ্য নন।’
প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, বিদ্যালয়ে বাস্তবে শিক্ষার্থী না এলেও কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, মাঝে মধ্যে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় করে শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয়। স্থানীয় চার-পাঁচজন ছাড়া কেউ না আসায় এমনটি করতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যালয়ের বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণের পর জবাব সন্তোষজনক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।



