আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা ন্যায়বিচারের দিকে একটি পদক্ষেপ

ডিপ্লোম্যটের বিশ্লেষণ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

গত ১০ মে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার অসাধারণ পদক্ষেপ নেয়, যে দলটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছিল। দেশের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দলটির স্থগিতাদেশ কার্যকর করা হয়, গত বছরের ‘বর্ষা বিপ্লব’ নামে পরিচিত ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিশাল বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দলটির কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষকদের বিভক্ত করেছে। কারো কারো মতে, এই নিষেধাজ্ঞা গণ-দমনের অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহিতার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদের জন্য, এটি সম্মিলিত শাস্তির একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে, রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরো গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করে এবং বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক উত্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দেশটি যখন ২০২৫ সালের শেষের দিকে বা ২০২৬ সালের প্রথম দিকে তার পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্রবিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে শিক্ষানীতি, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের জন্ম দেয়। কিন্তু বিক্ষোভগুলো দ্রুত দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। হাজার হাজার ছাত্র, বিরোধী কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকরা হাসিনার শাসনামলের বছরের পর বছর ধরে নির্যাতনের জন্য নতুন নির্বাচন, সংস্কার এবং বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নৃশংস। নিরাপত্তাবাহিনী, প্রায়ই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বিসিএল) মতো সরকারপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীগুলোর সহায়তায়, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এবং তাজা গুলি ব্যবহার করে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো নির্বিচারে গ্রেফতার, নির্যাতন, গুম এবং যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করে যা হাসিনার আমলের দমন-পীড়নের কৌশলগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়।

২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম দিকে, ক্ষমতার পতন এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখোমুখি হয়ে হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

প্রাথমিকভাবে নতুন সরকার ব্যক্তিদের জবাবদিহি করার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আওয়ামী লীগের কয়েক ডজন কর্মকর্তা, পুলিশ কমান্ডার এবং ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেফতার করা হয় বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসঙ্ঘের একটি তথ্য-অনুসন্ধান মিশন পরে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের আহ্বান জানায়। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে বিষয়টি আরো তীব্র করে তোলে। কর্মকর্তারা বলেন, একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা শেষ না করা পর্যন্ত দলটি নিষিদ্ধ থাকবে। নির্বাচন কমিশন দ্রুত আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে এবং কার্যকরভাবে পরবর্তী নির্বাচনে তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেয়।

নিষেধাজ্ঞার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, দমন-পীড়নের সময় আওয়ামী লীগের পদক্ষেপ, বছরের পর বছর ধরে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রমাণ করে। তারা ‘জঙ্গি গণতন্ত্র’ ধারণার দিকে ইঙ্গিত করে, যা রাষ্ট্রগুলোকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয়ভাবে ধ্বংস করে এমন গোষ্ঠীগুলোকে নিষিদ্ধ করে আত্মরক্ষার সুযোগ দেয়।

তারা বিশ্বব্যাপী নজিরগুলো উদ্ধৃত করে : যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে নাৎসি পার্টির নিষেধাজ্ঞা, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টির পতন এবং রুয়ান্ডায় গণহত্যা-পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন করে সহিংসতা বা কর্তৃত্ববাদী পুনর্জন্ম রোধ করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন নিষিদ্ধ করা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, আওয়ামী লীগ অনেক আগেই একটি গণতান্ত্রিক দলের মতো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। গত দশকে অনিয়ম এবং বয়কটের দ্বারা নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিচার বিভাগকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে এবং বিরোধী ব্যক্তিত্বদের নিয়মিতভাবে জেলে পাঠিয়ে তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের দমন-পীড়ন ছিল ক্ষমতা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক একটি দমনকারী সরকারের চূড়ান্ত, রক্তাক্ত অধ্যায়।

কিন্তু সমালোচকরা যুক্তি দেন যে, দেশের প্রাচীনতম এবং একটি প্রভাবশালী দলকে নিষিদ্ধ করা মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতি লঙ্ঘনের ঝুঁকি বহন করে। কর্তৃতত্ববাদী দলগুলোকেও সংস্কার করা যেতে পারে বলে যুক্তি দেন। এই বছরের শুরুতে জাতিসঙ্ঘের একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ‘অপরাধমূলক আচরণের চেয়ে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার শাস্তি দেয়া বিপজ্জনক।’

নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো- এর বিস্তৃত প্রকৃতি। আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যকলাপ, যার মধ্যে রয়েছে এর মহিলা, যুব এবং ছাত্রসংগঠন স্থগিত করা হয়েছে। এর অফিস বন্ধ, ওয়েবসাইট অফলাইনে রাখা এবং অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিক তদন্তাধীন বিষয়গুলোর বাইরেও বিস্তৃত।

দলের সাধারণ সদস্য এবং সমর্থকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে তাদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছে। তারা তাদের পছন্দের দলের জন্য প্রচারণা, সংগঠিত বা ভোট দিতে পারবে না। আওয়ামী লীগ এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর মধ্যে ইতোমধ্যে গভীরভাবে বিভক্ত একটি দেশে এটি আরো বিচ্ছিন্নতা এবং ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ইতোমধ্যে প্রতিহিংসার চক্র দ্বারা চিহ্নিত। ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেছিল এবং তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছিল। এখন একই ধরনের আইনি হাতিয়ার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হচ্ছে। সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার অনুশীলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পক্ষই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, একটি স্বাভাবিক কৌশল হয়ে উঠতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার পেছনে আইনি প্রক্রিয়াও প্রশ্ন উত্থাপন করে। আদালতের রায় থেকে উদ্ভূত নয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে একটি নির্বাহী আদেশ থেকে এই সিদ্ধান্ত এসেছে, আইন সমালোচকরা বলছেন যে, বারবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা খালাস পেলে কী হবে? নাকি ট্রাইব্যুনাল স্থগিত হবে? দলটি কি অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে? পুনর্বহালের জন্য কোন শর্ত পূরণ করতে হবে সে সম্পর্কে খুব কম স্পষ্টতা রয়েছে, যা উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তোলে যে, স্থগিতাদেশটি ডিফল্টভাবে স্থায়ী হতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল জনসাধারণের চাপ। মে মাসের গোড়ার দিকে ঢাকায় বিশাল সমাবেশ আওয়ামী লীগের বিলুপ্তির দাবি জানায়। বিক্ষোভকারীরা, যাদের অনেকেই ছাত্র যারা দমন-পীড়নে বন্ধু হারিয়েছিলেন, তারা দলটির অপসারণকে ন্যায়বিচারের দিকে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৯০ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনে ছাত্র আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০২৪ সালের বিক্ষোভ এই ঐতিহ্যের সাথে খাপ খায়। তবে রাস্তার চাপের মাধ্যমে শাসন করা তার নিজস্ব ঝুঁকি তৈরি করে। আইনগত বা রাজনৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্তগুলো সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বৈধতা বজায় রাখার জন্য বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো দ্রুত পূরণ করতে বাধ্য হতে পারে।

যদিও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ বৈধ, একটি টেকসই গণতন্ত্রের জন্য কেবল জনসমাগম নয়; বরং সুচিন্তিত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। যদি রাজনৈতিক ফলাফলগুলো সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে উচ্চৈঃস্বরে জনতার নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং আঞ্চলিক গতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলবে। ঐতিহ্যগতভাবে হাসিনা সরকারের মিত্র ভারত, রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য সঙ্কুুচিত স্থান নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। নয়াদিল্লি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বা ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান তার উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পশ্চিমা অংশীদাররা একইভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও প্রতিবাদে মৃত্যুর তদন্ত এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিসহ জবাবদিহিতার দিকে পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো সেই ভারসাম্য বজায় রাখা : দলীয় প্রতিশোধ না নিয়ে অপরাধের শাস্তি দেয়া।

নির্বাচন সামনে থাকায়, প্রশ্নটি কেবল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি না তা নয়; বরং বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাবর্তন বা বৈধ বহিষ্কারের জন্য যথেষ্ট স্থিতিশীল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে কিনা তা।

পরিশেষে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কেবল দোষীদের জবাবদিহি করার ওপর নির্ভর করে না; বরং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য জায়গা তৈরির ওপরও নির্ভর করে। যদি নিষেধাজ্ঞা নতুন একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটি সেই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করবে যা প্রথমেই বিদ্রোহকে ইন্ধন দিয়েছিল।