সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
দিনভর উৎসবে ভালোবাসা দিবস আর বসন্তকে বরণ করেছে নগরবাসী। এ উপলক্ষে বসন্তের প্রথম দিনে রঙিন আবহে সেজেছিল রাজধানী। হলুদ-লাল শাড়িতে নারীরা, আর হলুদ পাঞ্জাবিতে তরুণরা প্রিয়জনের সাথে সময় কাটিয়েছেন। এ উৎসবমুখর পরিবেশে ফুল কিনতে সকাল থেকেই ভিড় জমে ফুলের বাজার শাহবাগ এলাকায়। সারি সারি ফুলের দোকানে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
তবে ঋতুরাজ বসন্ত বরণে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভেতরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ সকাল থেকে বিপুল প্রাণের উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত হয়েছিল। ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ আহ্বান নিয়ে ৩৮তম বারের মতো বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছিল জাতীয় বসন্ত উদ্যাপন পরিষদ। সকাল ৮টায় বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীদের সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের কার্যক্রম। এর পর দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের একক সঙ্গীত, আবৃত্তির সাথে ছিল দলীয় সঙ্গীত আর নৃত্যের একের পর এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে অধিকাংশ গান, আবৃত্তি আর নৃত্য ছিল বসন্ত নিয়ে।
অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা, বিশেষত নাচের শিল্পীরা এসেছিলেন বর্ণাঢ্য সাজে। দর্শকরাও অংশ নিয়েছিলেন বসন্তের ঐতিহ্যবাহী সজ্জায়। নারীদের পরনে ছিল বাসন্তী রঙের ছাপা শাড়ি, খোঁপা বা মাথায় ফুলের সজ্জা। পুরুষদের বেশির ভাগই পরেছেন উজ্জ্বল বর্ণের পাঞ্জাবি।
যদিও উৎসব শুরু হয়েছিল ১৪০১ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। এর পর থেকে বরাবর সেখানেই দিনভর উৎসব হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর পরিবেশ পাল্টে যায়। বকুলতলায় উৎসব করার আর অনুমতি মেলেনি। বকুলতলায় আশ্রয় হারিয়ে ‘অনিকেত’ আয়োজকরা এরপর বিভিন্ন স্থানে উৎসব আয়োজনের জন্য চেষ্টা করেছেন। অনুমতি না পাওয়ায় তারা শরণাপন্ন হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাছে। বসন্তকথনে এই কথাগুলোই তুলে ধরলেন আয়োজকরা।
জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী বলেন, ‘এবারই প্রথম চারুকলার বকুলতলার বাইরে উৎসবটির আয়োজন করতে হলো। বকুলতলাতেই উৎসব করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেখানে অনুমতি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজনটি করতে হয়েছে।
সম্মেলক গানের মধ্যে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা ছিল। নৃত্যে অংশ নিয়েছে অনেকগুলো সংগঠন। তাদের মধ্যে ছিল গৌড়ীয় নৃত্য একাডেমি, নবচেতনা, গারো কালচারাল একাডেমি, নৃত্যর, তুরঙ্গমী, অংশী, ভাবনা, দিব্য, নন্দিনী নৃত্যালয়, নর্তনম, জাগো আর্ট সেন্টার, নৃত্যলোক, নৃত্যাক্ষ, ধৃতি নর্তনালয়, বাংলাদেশ একাডেমি অব পারফর্মিং আর্ট, সাধনা, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র, ফিকা চাকমা, মম কালচারাল সেন্টার, নৃত্যালোকসহ অনেকে। সঞ্চালনা করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী ও আহসান দিপু।
এ দিকে বর্ণিল আয়োজন ও উৎসবমুখর পরিবেশে বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস উদযাপন করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ডিআরইউ বাগানে ‘বসন্ত দিনে ভালোবাসার গান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সকালে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল। আর সমাপনী বক্তব্য দেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন।
ডিআরইউর সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো: মনোয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সংগঠনের অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম জসিম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিজান চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য আলী আজম, মাহফুজ সাদী, আল-আমিন আজাদ, সুমন চৌধুরী ও মো: মাজাহারুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে প্রেম, প্রকৃতি ও বসন্তকে ঘিরে বিভিন্ন জনপ্রিয় গান পরিবেশিত হয়, যা উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। এ আয়োজনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন লাভলী শেখ, ফারজানা ইভা, এম আর মানিক, মিতু মণ্ডল ও ফকির জহির।
সমাপনী বক্তব্যে আবু সালেহ আকন বলেন, ‘প্রকৃতির এই নবজাগরণের মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়- পরিবর্তনই জীবনের চিরন্তন সত্য। শীতের নির্জীবতা পেরিয়ে যেমন গাছে গাছে নতুন পাতা আসে, তেমনি প্রতিকূলতা পেরিয়ে সমাজেও আসে নতুন সম্ভাবনার সূচনা।’
তিনি বলেন, ‘সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা কাজ করি মানুষের অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে। বসন্ত আমাদের শেখায় সাহস, সততা ও আশার কথা- যা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অনুপ্রেরণা জোগায়।’



