আব্দুল আজিজ মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারের বন্যাকবলিত এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে, তবে ভেসে উঠছে ক্ষতির ভয়াবহ চিহ্ন। বিধ্বস্ত হয়েছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, উঠে গেছে সড়কের কার্পেটিং। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। কৃষি জমি তলিয়ে গিয়ে আউশ ফসল, আমনের হালিচারা ও শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সরকারি তথ্য মতে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর ১৪টি স্থানের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার পাঁচটি উপজেলা মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী ও কমলগঞ্জ। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো জানিয়েছে, সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা হবে।
বন্যায় ৯০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ও পাঁচটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচটি উপজেলায় অন্তত চার হাজার বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এতে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। এলজিইডির ১৩৮ কিলোমিটার সড়ক এবং সাতটি ব্রিজের ৩৮ মিটার অংশ বিধ্বস্ত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৬১ কোটি টাকার বেশি। বছর বছর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়ায় কষ্টের ফসল হারাতে হয়। তাই ত্রাণ দেয়ার বদলে এবার স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রাজনগর উপজেলার উজিরপুর গ্রামের বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, বন্যায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যা এলেই প্রশাসন শুধু শুকনো খাবার নিয়ে আসে। এই চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বছর ঘুরে বন্যার তাণ্ডব ঘটে, তাই প্রাক-প্রস্তুতি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে এসব সাময়িক সাহায্য নিষ্ফল হয়ে যাবে।
একই গ্রামের রফিক মিয়া বলেন, আউশ ধান নষ্ট হয়েছে, আমনের চারা পলিমাটির নিচে চাপা পড়েছে। এখন টিকে থাকার জন্য আমাদের হালিচারা প্রয়োজন। শুধু ত্রাণের চাল দিয়ে আমরা কী করব? কৃষক আবুল কালাম জানান, তার চার বিঘা আউশ নষ্ট হয়েছে, পাশাপাশি তিন বিঘা আমনের চারা নষ্ট হওয়ায় তিনি এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা। হরিপাশা গ্রামের উস্তার মিয়া জানান, মনু নদীর পরিত্যক্ত জলাশয়ে যৌথ ফিশারি ডুবে তাঁদের ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। কুলাউড়ার জাবদা গ্রামের মিছবাউর রহমান জানান, তাঁর চার বিঘা জমির সবজি নষ্ট হয়েছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন জানান, ৮৫.৭ হেক্টর আউশ, ৫৫.১ হেক্টর আমনের বীজতলা ও ৫৫.৪ হেক্টর সবজি নষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগে মোট ক্ষতি হয়েছে পাঁচ কোটি আট লাখ টাকার। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রণোদনার আওতায় আনা হচ্ছে। জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রের খবর, ৪০৫টি পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: খালেদ বিন অলীদ বলেন, পাউবোর ক্ষতি হয়েছে এক কোটি টাকা। ধলাই নদীতে সমীক্ষা করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। মনু নদীর ভাঙন রোধে ২০২১ সালে ৯৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প শুরু হলেও ২০২৩ সাল থেকে বিএসএফের বাধায় কুলাউড়ার চারটি এলাকায় কাজ বন্ধ রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে দিল্লিতে চিঠি পাঠানো হলেও অগ্রগতি হয়নি। এখন উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি।



