বেলেমে জমে উঠেছে জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০। দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিতেই আলোচনার টেবিলে স্পষ্ট হয়েছে বড় দেশগুলোর কৌশল, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগ এবং দরকষাকষির তীব্র সুর। প্রথম সপ্তাহে যেসব ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির ঝড় উঠেছিল, এখন সেগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনের লড়াই বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে বৈঠক কক্ষের ভেতরে-বাইরে এখন প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ; আলোচকদের ভাষায় ‘গেম শেষ মুহূর্ত পর্যন্তই খেলা হয়।’
বিশ্ব যখন জলবায়ু বিপর্যয়ের রুদ্ধদ্বার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, তখন কপ৩০-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে আলোচনা এক সুস্পষ্ট বার্তার দিকে ঝুঁকেছে, প্রকৃতি রক্ষা ছাড়া জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। প্রথম সপ্তাহের ৩০টিরও বেশি ঘোষণা সাময়িক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও প্রতিনিধিরা এখন বুঝে নিয়েছেন, বন, জীববৈচিত্র্য, আদিবাসী অধিকার এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে কেন্দ্র স্থানে না আনলে আলোচনা আরেকটি ‘অসমাপ্ত সম্মেলন’এ পরিণত হতে পারে।
ব্রাজিলের বেলেম নগরীতে গতকাল সোমবার দ্বিতীয় সপ্তাহের মন্ত্রী বা উচ্চপর্যায়ের আলোচনার শুরুতে এসব বিষয় উঠে এসেছে। জলবায়ু সঙ্কটে নাজুক পৃথিবীর ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া কপ৩০-এ দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আলোচনার টেবিলে গভীর অচলাবস্থা। অর্থায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিযোজন এবং জেন্ডার সমতা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলোতেই কোনো অগ্রগতি নেই। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সতর্ক বার্তা-বাস্তব সহায়তা ছাড়া বৈশ্বিক উচ্চাকাক্সক্ষা এখন কেবলই ‘কাগুজে স্বপ্ন’, আর জলবায়ু দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিদিনই।
ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির বন্যা : কপ৩০কে ‘ইমপ্লিমেন্টেশন কপ’ হিসেবে দেখার যে প্রত্যাশা ছিল, প্রথম সপ্তাহে তা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। জ্বালানি, অর্থায়ন, কার্বন বাজার, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি-সব ক্ষেত্রেই এসেছে বড় আকারের ৩০টিরও বেশি ঘোষণা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ) যা বিশ্বের ট্রপিক্যাল বনাঞ্চল সুরক্ষা, কার্বন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়ার নতুন মডেল তৈরি করবে। একই সাথে এসেছে বেলেম ডিক্লারেশন, যা ক্ষুধা-দারিদ্র্য মোকাবিলা, মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং জলবায়ু ন্যায্যতার ওপর জোর দিয়েছে। টেকসই জ্বালানি ব্যবহারে চারগুণ প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি, কার্বন বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানো, অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ- সব মিলিয়ে কপ৩০-এর প্রথম সপ্তাহে অনেক কিছুই সামনে এসেছে। তবে মূল প্রশ্ন একই- এগুলোর কোনোটিই অর্থায়ন ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব না। আর সেখানেই দ্বিতীয় সপ্তাহের আলোচনার টেবিলে দরকষাকষি শুরু হয়েছে।
অর্থায়নকে ঘিরে টানাপড়েন : জলবায়ু অর্থায়ন কপ৩০-এর কেন্দ্রীয় ইস্যু। উন্নয়নশীল দেশগুলো চাইছে- অভিযোজনের জন্য নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য তহবিল, লস অ্যান্ড ড্যামেজ মোকাবিলায় দ্রুত অর্থ ছাড়, সহজ প্রবেশাধিকারের নিশ্চয়তা,আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো।
অন্য দিকে দাতা দেশগুলো জোর দিচ্ছে- স্বচ্ছতা, ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন, বেসরকারি খাতকে বড় অংশীদার করার প্রয়োজনীয়তা।
এ দুই পক্ষের অবস্থানের বৈপরীত্য বাড়ায় অনেক খাতেই সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অভিযোজন ও লস অ্যান্ড ড্যামেজে ‘কে কত দেবে’- এই প্রশ্নে দরকষাকষি সবচেয়ে তীব্র।
প্রকৃতিকেন্দ্রিক জলবায়ু পদক্ষেপই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু : গতকাল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকগুলো দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করেছে। কপ৩০-এর মূল থিম ‘জলবায়ু পদক্ষেপের কেন্দ্রে প্রকৃতি’ অর্থাৎ প্রকৃতি বিশেষ করে বন, জীববৈচিত্র্য এবং এদের পাহারাদার আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী-জলবায়ু সমাধানের কেন্দ্রস্থলে থাকবে। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার যে তিনটি বড় মাইলফলক সামনে আসছে তা হলো-উচ্চ পর্যায়ের বনঅর্থায়ন সংলাপ অর্থাৎ ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফর এভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ)-এর ভিত্তিতে নতুন বন-অর্থায়ন মডেল নির্মাণ, রেইনফরেস্ট সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে দায়বদ্ধতা বাড়ানো হবে আলোচনার প্রধান বিষয়;
অভিযোজন তহবিল বাড়াতে নতুন প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ
জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোজন তহবিল জোগাড়ে দাতা দেশগুলো নতুন অর্থ ঘোষণা করতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রত্যাশা-এবার যেন কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় এবং বায়োইকোনমি চ্যালেঞ্জের উদ্বোধন অর্থাৎ জি২০-এর নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে বৈশ্বিক ‘সোশিও-বায়োইকোনমি’ গড়ে তোলার রূপরেখা প্রকাশ করবে এ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, টেকসই উৎপাদন, সবুজ কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করা।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী : আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে :
কপ৩০-এ প্রতিদিনই একাধিক সেশন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, ভূমির মালিকানা এবং নতুন জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থায় তাদের নেতৃত্ব নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল ছিল ১.৮ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ড-টেনিউর প্রতিশ্রুতি, গ্লোবাল মিথেন প্লেজ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, আদিবাসী শাসনব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল।
বন রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এসব জনগোষ্ঠীর ভূমিকা যে অপরিহার্য-এবার বৈশ্বিক নেতৃত্ব তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উচ্চস্বরে স্বীকার করছে।
ক্ষতিপূরণ দাবি : ইতিহাস, বাস্তবতা ও হতাশার দীর্ঘ পথ : লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের দাবি নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে জলবায়ুসৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আলাদা বৈশ্বিক তহবিল গঠনের ওপর। বছর বছর প্রতিশ্রুতি এসেছে, রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, কিন্তু বাস্তব অর্থায়নের হার ছিল নগণ্য। কপ২৭-এ এই তহবিল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলেও এখনো পর্যন্ত তাতে টেকসই, পূর্বানুমানযোগ্য বা যথেষ্ট অর্থ আসেনি।
২০২৩-২৪ সালে কয়েকটি দেশ প্রতিশ্রুতি দিলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। বাংলাদেশের মতো দেশ, যাদের অর্থনীতি ও অবকাঠামো বারবার জলবায়ু আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা বলছে- ‘এই তহবিলের লক্ষ্য সহায়তা নয়, ন্যায়বিচার। কারণ আমরা দায়ী নই, কিন্তু ভুগছি সবচেয়ে বেশি।’ এমন বাস্তবতায় কপ৩০-এ ক্ষতিপূরণ ইস্যু নতুন করে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
সম্মেলনজুড়ে প্রত্যাশা: সমাধান, সমঝোতা ও বাস্তবায়ন : কপ৩০-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে আলোচনার টেবিলে তীব্র দরকষাকষি চললেও একটা বিষয়ে সবার অবস্থান মিলছে-প্রকৃতি রক্ষা, বন সংরক্ষণ এবং যেসব জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী এ সম্পদ রক্ষা করে এসেছে, তাদের ক্ষমতায়ন ছাড়া কার্যকর জলবায়ু সমাধান সম্ভব নয়। সুতরাং বেলেমে এখন সিদ্ধান্ত- দুয়ার খুলতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সমঝোতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা।
জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল গতকাল কপ৩০-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে প্রথম সপ্তাহের অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘প্রথম সপ্তাহজুড়ে যে সদিচ্ছা ও সহযোগিতার মনোভাব দেখেছি, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে, এই বৈশ্বিক জলবায়ু সঙ্কট থেকে মানবতার বাঁচার একমাত্র পথ হলো প্যারিস চুক্তি, এবং জলবায়ু পদক্ষেপের সুফল সব দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে এই কাঠামোকেই শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে।’
প্রথম সপ্তাহেই যে অর্থনৈতিক গতি দেখা গেছে, তা উল্লেখ করে স্টিল জানান, ‘নতুন অর্থনীতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত উঠে আসছে। শুধুমাত্র গত বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে- যা বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশের জিডিপির চেয়েও বেশি।’
তার ভাষায়, এই অগ্রগতি কোনো ‘লাক্সারি’ নয়, বরং ‘মিশনক্রিটিক্যাল বাস্তবতা’। জলবায়ু পদক্ষেপকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশগুলোকে বাস্তব অর্থনীতির পরিবর্তনের সাথে সমানতালে এগোতে হবে। কিন্তু এখানেই বড় বাধা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে আলোচনাকক্ষের অগ্রগতি এখনো বাস্তব অর্থনীতির গতির সাথে তাল মেলাতে পারেনি। সদিচ্ছা আছে, কিন্তু গতি যথেষ্ট নয়।’
জলবায়ু দুর্যোগের তীব্রতা ও জরুরি সিদ্ধান্তের আহ্বান জানিয়ে স্টিল স্মরণ করিয়ে দেন, ‘জলবায়ুসৃষ্ট দুর্যোগ এখন লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংস করছে, প্রতিটি অর্থনীতিকে আঘাত করছে, খাদ্যসহ জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের দাম বাড়াচ্ছে’।
তিনি বলেন, ‘আমরা যে বলেছি আমাজনে দ্রুততা দরকার, সেই একই দ্রুততা দরকার আমাদের আলোচনায় ও সিদ্ধান্তে।’
স্টিল জোরালো ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ‘দয়া করে কঠিন বিষয়গুলো দ্রুত হাতে নিন। যখন এগুলোকে অতিরিক্ত সময়ে ঠেলে দেয়া হয় সবারই ক্ষতি হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন কোনো কৌশলগত বিলম্ব, ট্যাকটিক্যাল জট বা সময় নষ্টের সুযোগ নেই। প্রদর্শনীর মতো কূটনীতি করার সময় শেষ। এখন হাতা গুটিয়ে কাজে নেমে পড়ার সময়।’



