ভোটের মাঠে তারেক রহমানের সরব উপস্থিতি

উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition

নির্বাচনের মাঠে তারেক রহমানের সরব উপস্থিতি ভোটের অনেক সমীকরণ পাল্টে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, দেশে ফিরে দলের চেয়ারম্যান যেভাবে দলকে নির্বাচনমুখী করে সর্বাত্মক ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন তাতে নেতাকর্মীরা দারুণভাবে উজ্জীবিত। সাধারণ মানুষের নিত্যকার আলোচনায়ও তিনি জায়গা করে নিয়েছেন, যা আগামী নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আঁটঘাট বেঁধে প্রচারে নেমেছে বিএনপি। প্রত্যেক আসনে দল মনোনীত প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তারেক রহমানও দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছেন। দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রুতি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে সাধারণ মানুষ আর জেন-জিদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারেক রহমান যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই জনস্রোত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে দলের প্রার্থী, নেতাকর্মী ছাড়াও সমর্থক শ্রেণী আশার আলো দেখছেন।

এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানান মাধ্যমে দলের প্রচার-প্রাচারণায় গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম ভাগেই নির্বাচনী ‘থিম সং’ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা না হলেও তাদের প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষিকার্ড, কিভাবে কৃষকদের ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে এসে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায়, এ বিষয়গুলো নিয়ে বিএনপির ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারে পুরো দল

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পুরোদমে প্রচারে নেমেছে বিএনপি। এর আগে রাত ১২টা ১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির ‘থিম সং’ প্রকাশ করেছে। ওই সময় থেকেই দেশের প্রত্যেক আসনের প্রার্থীরা ব্যানার, ফেস্টুন লাগিয়েছেন। সকাল থেকে নেমে পড়েন নির্বাচনী প্রচারণায়। কেউ বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করে, কেউ শহীদ জুলাই যোদ্ধার কবর জিয়ারত করে আবার কেউ মসজিদে দোয়া মিলাদের মধ্য দিয়ে এ প্রচার আরম্ভ করেন। রাস্তাঘাটে, হাট-বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে লিফলেট বিতরণ করছেন। এলাকাভিত্তিক নানান প্রতিশ্রুতি সংবলিত এসব লিফলেটে উন্নয়নকে জোর দিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ আর মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণায় দলের প্রত্যেক স্তরের নেতাকর্মীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে যার যার নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোট চাইতে টিম করে পাঠানো হয়েছে। ঢাকাতেও এ রকম আসনভিত্তিক টিম গঠন করা হয়েছে। এমনকি আসনের ওয়ার্ডভিত্তিক, ইউনিটভিত্তিক ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দলসহ অন্যান্য সংগঠনের আলাদা আলাদা টিম গঠন করেছে দলটি। তারা এলাকার সমস্যা সমাধানে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

অন্য দিকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সমাবেশ করেন। তার উপস্থিতিতে প্রত্যেক সমাবেশে লাখো নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে নির্বাচনী বড় শোডাউন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যেমন দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন তেমনি সাধারণ মানুষও ছিলেন তারেক রহমানকে এক নজর দেখতে, তার বক্তব্য শুনতে। দেশ গঠনে তার ৩১ দফার সাথে আট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি তার ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’ তুলে ধরছেন। গভীর রাত এমনকি ভোররাতেও সমাবেশ করছেন তারেক রহমান। গত শুক্রবার ভোর ৪টায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সারারাত ধরে উপস্থিত নেতাকর্মী আর সাধারণ মানুষের সামনে তিনি তার দেশ গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরে ধানের শীষে ভোট চান।

বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছেন, নির্বাচনের মাঠে তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ভোটের অনেক সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। তার বক্তব্যের ধরনও ভিন্ন। তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের মঞ্চে ডেকে যেভাবে ‘ইন্টারঅ্যাকশন’ করছেন তা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপি জানিয়েছে, দীর্ঘ ২০ বছর পর আজ চট্টগ্রামে যাবেন তারেক রহমান। কাল নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেবেন। এরপর ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় ফিরবেন।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে এর আগে অনেক সমাবেশ হয়েছে, কিন্তু এবারের সমাগম হবে ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিন পর তারেক রহমান নিজে চট্টগ্রামে এসে কথা বলবেন, এটি মানুষ ভিন্নভাবে গ্রহণ করছে। এটি কোনো একক দলের কর্মসূচি নয়, এটি একটি জনসম্পৃক্ত আয়োজন।

তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রাম সফরে আসেন ২০০৫ সালের ৬ মে। বিএনপির মরহুম চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এর ১৪ বছর পর একই মাঠে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার সন্তান তারেক রহমানের বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে ফিরে ২৬ জানুয়ারি বরিশালে যাবেন তারেক রহমান। ওই দিন নগরের বেলস পার্কে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন। পরে বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতাদের সাথে সভা করে মাদারীপুর, ভাঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জ হয়ে ঢাকায় ফিরবেন।

ডিজিটালি প্রচারণায় গুরুত্ব

অনেক আসনে বিএনপি প্রার্থীরা ভোটারদের সাথে কানেকশন বাড়াতে ওয়েবসাইট, সফটওয়ার খুলেছেন। এসব সাইটে ভেটাররা তাদের মতামত দিতে পারবেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা অভিযোগ জানাতে পারবেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সমাধানও করছেন বলে জানান ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন।

আবার ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও সাধারণ ভোটারদের সাথে কানেকশন তৈরি করছেন কেউ কেউ। ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক বলেন, তিনি ডিজিটালি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর সব চেষ্টাই করছেন। এর মধ্য দিয়ে খুব সহজেই তার এলাকার লোকজন তাদের মতামত দিতে পারেন, কঠোর গোপনীয়তায় অভিযোগও জানাতে পারেন। সেসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তার এলাকার সন্ত্রাসী, মাদক নির্মূলে অনেক কাজ সম্ভব হয়েছে ইতোমধ্যে।

এসবের বাইরে দলের প্রত্যেক প্রার্থী তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেও ভিডিও বার্তা, প্রতিশ্রুতি, বিগত দিনের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রচার করছেন।

এখনো যেতে পারেনি ভোটারদের দ্বারে

তবে এর মধ্যেও দলকে সব জায়গায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিতে পারেননি নেতাকর্মীরা। তারা পথেঘাটে, রাজপথে সক্রিয় থাকলেও দলের বার্তা নিয়ে সমন্বিতভাবে ডোর টু ডোর এখনো পৌঁছাতে পারেনি। যেখানে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নারী সংগঠন দেশের অর্ধেক নারী ভোটারদের টার্গেট করে সক্রিয়তা পালন করছে সেখানে বিএনপির মহিলা দল অনেকটাই পিছিয়ে। আবার যেখানে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ঘরে-ঘরে ভোটার স্লিপ পৌঁছানো কর্মসূচি শেষ করেছে সেখানে বিএনপি শুরুই করতে পারেনি। এতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে পড়ছে বিএনপি, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐক্যবদ্ধ দলে কিছু আসনে কোন্দলে বিভক্তি

এসবের বাইরে দেশের অর্ধশতাধিক আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী, বিদ্রোহী এবং বঞ্চিতদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিভক্তি বাড়ছে। এটাকে কমিয়ে আনার প্রক্রিয়া এখনো শেষ করতে পারেনি দলটি। কোথাও কোথাও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। এই অস্থিরতা দ্রুত থামানো না গেলে নির্বাচনী ফলে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে দলের সিনিয়র নেতারা মনে করছেন।

অবশ্য তারা বলছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি। গত বুধবার ৫৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরআগে আরো ১২ জন্য প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। সবমিলে এ পর্যন্ত ৭১ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আবার বেশ কয়েকজন প্রার্থী দলের সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। যারা সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনের মাঠে শেষ পর্যন্ত থাকবেন; দল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। তাদের কর্মী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সামনে তাদের বিরুদ্ধে আরো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়াও তাদের কর্মী ও সমর্থকরা বিভিন্ন উদ্দেশ্য হাসিলে কাজ করছেন। এটা নির্বাচনের আগে দলের বড় ক্ষতি হবে। যুগপৎ আন্দোলনে যেসব নেতাকে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে, সেখানে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। এসব নির্বাচনে প্রভাব অবশ্যই পড়বে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর শোনা কথায় কান দেয়া যাবে না। এসব কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা সময়ই বলে দেবে।