দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা

রেশনিং প্রত্যাহার জ্বালানি তেলে

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করেছে সরকার। গতকাল রোববার থেকে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহে আরোপ করা সব ধরনের সীমাবদ্ধতা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দেশের সব ফিলিং স্টেশন এখন নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে জ্বালানি তুলতে পারবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনন্যা ইসলাম অমিত সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা তেলের একাধিক চালান পৌঁছানোর ফলে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল হয়েছে। এ কারণে জ্বালানি বিতরণে আরোপিত রেশনিংসহ সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ সৃষ্টি হয়। এতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবেলায় গত ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সে সময় ফিলিং স্টেশনগুলোকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে জ্বালানি উত্তোলনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

তবে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত তেলবাহী একাধিক জাহাজ পৌঁছানোর পর সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফ সাদেক বলেন, রেশনিং তুলে নেয়ার ফলে ফিলিং স্টেশনগুলো এখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তুলতে পারবে। একই সাথে গ্রাহকরাও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন।

জ্বালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন উত্তোলনের ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশনগুলোর ওপর আর কোনো নির্দিষ্ট সীমা থাকবে না। তারা স্থানীয় চাহিদা বিবেচনায় ডিপো থেকে জ্বালানি উত্তোলন করতে পারবে। এতে বাজারে সরবরাহ আরো দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

সরকার এরইমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানিকে মৌখিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে দেশের সব জ্বালানি বিতরণকেন্দ্রে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। কর্মকর্তারা বলছেন, রেশনিং তুলে নেয়ার ফলে এত দিন সীমিত সরবরাহের কারণে যেসব ফিলিং স্টেশন চাপে ছিল, সেগুলো এখন স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এতে পরিবহন খাতেও স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ দিকে পেট্রল পাম্প মালিকরাও দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, আজ সোমবার সন্ধ্যার মধ্যেই সারা দেশে জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিনি জানান, এরইমধ্যে অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল পৌঁছাতে শুরু করেছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ঘাটতির কারণে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চালকেরা জ্বালানি পেতে ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক জায়গায় ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা যায় এবং অনেক পাম্পে জ্বালানি সঙ্কটের খবর পাওয়া যায়। রেশনিং ব্যবস্থা চালু থাকায় অনেক ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং কৃষি খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম এবং আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দেশের সব জ্বালানি বিতরণকেন্দ্রে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। এতে পরিবহন ও কৃষি খাতে চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়ে। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত মজুদ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা প্রয়োজন। তবে আপাতত রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের ফলে বাজারে স্বস্তি ফিরছে। সামনে ঈদযাত্রা ও কৃষি মৌসুমের ব্যস্ত সময়কে সামনে রেখে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আমদানি করা তেলের চালান নিয়মিতভাবে পৌঁছাতে থাকলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে এবং সাম্প্রতিক সঙ্কট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

খুলনায় ব্যবসায়ীদের ডিপো থেকে তেল উত্তোলন শুরু

খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত তিন জ্বালানি তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোয় গতকাল দুপুর থেকে উত্তোলন শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে একদিন বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে তেলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সাথে জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুলের ফোনে আলোচনা হওয়ার পর দুপুর ১২টার পরে ব্যবসায়ীরা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে তেল উত্তোলন শুরু করেন। কাবুল জানান, আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিপিসির রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালনি তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত মন্ত্রী প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছেন । তার ভিত্তিতে ব্যবসায়ীরা তাদের তেল উত্তোলন বন্ধ রাখার কর্মসূচি স্থগিত করেন।

চাহিদা অনুযায়ী তেল চেয়ে ব্যর্থ হয়ে গত শনিবার সকাল থেকে খুলনা বিভাগের ১০ ও বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলায় জ্বালানি ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় তেল উত্তোলন ও বিপনন বন্ধ করে দেয়। শনিবার সারা দিন পদ্মা মেঘনা ও যুমনা তেল ডিপোতে একটিও ট্যাংকলরি ঢুকতে দেয়নি আন্দোলনকারীরা। অপরদিকে তিনটি তেল ডিপোর বিশৃঙ্খলা ও ডিপোগুলোর কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

খুলনা বিভাগীয় ট্যাংকলরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসের প্রেক্ষিতে রোববার সকাল থেকে আগের মতো জ্বালানি তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসায়ীকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্য মতে, খুলনা বিভাগসহ ১৫ জেলায় প্রতিদিন অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির চাহিদা অন্তত ৩৬ লাখ লিটার। অথচ তিনটি ডিপো থেকে সরবরাহ করা হচ্ছিলো মাত্র সাড়ে ১০ লাখ লিটার। এর প্রতিবাদে শনিবার সকাল থেকে দিনভর ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ রাখায় সন্ধ্যার পর থেকে খুলনার অধিকাংশ পেট্রল পাম্প তেলশূন্য হয়ে পড়ে। গতকাল সকাল থেকে অনেক পাম্পে তেল নেয়ার জন্য অনেক মানুষকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকে মোটরসাইকেল নিয়ে এক পাম্প আরেক পাম্পে ঘুরে বেড়ান। আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি সকাল থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে কয়েকটি পাম্পে।