কালবৈশাখী ও টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ক্ষেত

Printed Edition
নাসিরনগরের হাওরে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাঁচা-পাকা ধান কাটছেন শ্রমিকরা	: নয়া দিগন্ত
নাসিরনগরের হাওরে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাঁচা-পাকা ধান কাটছেন শ্রমিকরা : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশের বিভিন্ন জেলায় কালবৈশাখী ঝড়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথাও ধান হেলে পড়েছে, কোথাও পানিতে তলিয়ে গেছে ধানের বিস্তীর্ণ জমি। শ্রমিক সঙ্কট, অতিরিক্ত মজুরি ও বাজারে ধানের কম দামের কারণে ধানচাষিদের দুর্ভোগ যেন দেখার কেউ নেই।

মতলব উত্তর (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, গত দুই দিন ধরে কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়ায় উপজেলার পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান হেলে পড়েছে। নিচু এলাকার অনেক ধানের জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ফসল হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

ইসলামাবাদ ইউনিয়নের কৃষক আজিজ মিয়া জানান, পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা ধান পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে তার ধান। কাটা ধানও শুকাতে না পারায় ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ১০ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ নিচু এলাকায়। এসব জমির ধান কাটতে দেরি হলে ক্ষতির ঝুঁকি আরো বাড়বে।

এদিকে দিনমজুর সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিঘাপ্রতি ধান কাটতে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা দিতে হচ্ছে শ্রমিকদেরকে। বৃষ্টির কারণে শ্রমিক পাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, বড় ধরনের ক্ষতির তেমন কোনো আশঙ্কা নেই। তবে, নিচু এলাকার ধান দ্রুত কাটতে হবে। কৃষকদের হারভেস্টার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কালবৈশাখী ঝড় ও টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার শত শত একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, নিচু এলাকার ধানের বিস্তীর্ণ জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কৃষকরা আধাপাকা ধান দ্রুত কাটার চেষ্টা করছেন। তবে তীব্র শ্রমিক সঙ্কটে ধান চাষিরা পড়ছেন মহা সঙ্কটে। বর্তমানে শ্রমিকপ্রতি মজুরি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এতে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা।

ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক জানান, বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়বে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, ভারী বৃষ্টি ও উজানের পানিতে উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের শত শত বিঘা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে চাষিদের মধ্যে।

ধান চাষিরা জানান, কাটা ধান শুকাতে না পারায় ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভিজা ধানে চারা গজিয়ে উঠছে। শ্রমিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। মাছমা গ্রামের কৃষক আইন উদ্দিন বলেন, ছয় বিঘার মধ্যে মাত্র দুই বিঘার ধান তুলতে পেরেছেন তিনি, বাকিটা পানিতে ডুবে গেছে। স্থানীয়রা জানান, একাধিক ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত এখন প্লাবিত হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে ধান চাষ করায় আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন।

কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, বাকিগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে। নৌকা দিয়ে ধান তোলার চেষ্টা চলছে। ইউএনও শিরিনা নাছরিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হাওরে পাকা ধান কাটার জন্য হারভেস্টার মেশিন ও শ্রমিক ডুবে যাওয়া ধান কাটতে এখন দিশেহারা শনির হাওরের ধানচাষিরা। এই হাওরে কৃষক আব্দুল মুকিতের ১০ কিয়ার জমির ধান হারভেস্টার মেশিনের অভাবে কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না। এ ছাড়াও প্রবল বৃষ্টিতে হাওরের জাঙ্গালে (মাটির সড়ক) ধান পরিবহন করতে না পারায় কৃষকরা পড়ছেন মহাবিপদে। এর সাথে যোগ হয়েছে শ্রমিক সঙ্কট। শুধু আব্দুল মুকিত নয়, কামাল হোসেন, তৌহিদ মিয়াসহ শনি, মাটিয়ান হাওরের শত শত কৃষক একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: শরীফুল ইসলাম জানান, চলতি বছর উপজেলার ২৩টি ছোট বড় হাওড়ে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যার মধ্যে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি ধান উৎপাদন হবে এ উপজেলায়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় কৃষকরা ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে পারছেন না। আমরা সার্বক্ষণিক তাদের পাশে আছি এবং পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, শ্রমিক সঙ্কট দূর করতে বিভিন্ন উপজেলায় যোগাযোগ করা হচ্ছে ও চিঠি দেয়া হয়েছে। জেলার বালু মহাল ও শুল্ক বন্দরগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে যেন সেসব এলাকার শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটতে আসেন। আমাদের পক্ষ থেকে কৃষকদের স্বার্থে সর্ব্বোচ্চ সহযোগী করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, পতনঊষার ইউনিয়নের কেওলার হাওরের পাশাপাশি নিম্নাঞ্চল এলাকায় ফসল ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। গত দু’দিনের অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কেওলার হাওরে প্রায় ৫০০ হেক্টর বোরোধান ডুবে গেছে। এ ছাড়া মুন্সিবাজার, শমশেরনগর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলেও বোরোধান এবং সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হয়ে গেছে পানিতে।

কমলগঞ্জের কৃষক আনোয়ার খান বলেন, গত দুই দিনের বৃষ্টিপাতে অনেক এলাকায় আগাম বন্যা হয়েছে। আধা পাকা বোরোধানের পাশাপাশি কিছু কিছু এলাকার সবজি ক্ষেতও নিমজ্জিত হচ্ছে।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বোরোধান ৭০ হেক্টর সম্পূর্ণ এবং ৩৫০ হেক্টর আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে। তাছাড়া সবজি ক্ষেতের বিষয়ে এখনো তথ্য আসেনি। পানি দ্রুত নেমে গেলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা নয় বলে তিনি জানান।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, কুলাউড়ার গোগালীছড়ায় প্রায় ১৫০ ফুট বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গত সোমবার রাতে মুষলধারার বৃষ্টিপাতে ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্র্্্ােেত সদর ইউনিয়নের বাগাজুরা, হাসনপুর, শ্রীপুর, করেরগ্রাম, মিনারমহল, সৈয়দপুর, গাজিপুর, পুরন্দপুর, হরিপুর, বড়কাপন গ্রামে ১০০ বিঘা আউশক্ষেত, বোরোক্ষেত, ধানের বীজতলা ও শতাধিক ফিশারি তলিয়ে গেছে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মহি উদ্দিন জানান, কুলাউড়া ও জয়চণ্ডি ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করছে।

রাঙ্গুনিয়া-কাপ্তাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে ঘরবাড়ি, বোরো ফসল ও বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। একাধিক স্থানে গাছ পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে। কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গুমাইবিল এলাকায় শতশত একর বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। মরিয়মনগর ব্লকের কৃষক রহিম বলেন, ধান কেটে মাঠে রেখেছিলাম। তীব্র বাতাস ও শিলা বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন সড়কে গাছ পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। প্রশাসন জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গাছ অপসারণ ও বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে।

রানীনগর (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, সোমবার ভোররাতে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে উঠতি ইরি-বোরো ধান জমিতে নূয়ে পড়েছে। পাকা ধানগুলো কাটার আগে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা। চাষিদের যত তড়াতাড়ি সম্ভব পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু শ্রমিক সঙ্কট যেন চাষিদের আতঙ্কের নতুন মাত্রা যোগ দিয়েছে।

হরিশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, আমি সোয়া তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। সোমবার ভোররাতে কালবৈশাখী ঝড়ে প্রায় সব ধান মাটিতে নূয়ে পড়েছে। শ্রমিক সঙ্কটের কারণে ধানগুলো কাটতে পারছি না। আকাশ খারাপের কারণে ধানের দামও কমতির দিকে। সব মিলে এবার লোকসানের আভাস দেখতে পাচ্ছি।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ উপজেলায় এবার ১৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ধান নূয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে আমরা কৃষি বিভাগ সব সময় মাঠে আছি। চাষিদেরকে তাড়াতাড়ি ধান কেটে ঘরে নেয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।