বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির দ্বৈত চাপ, বাড়বে জীনযাত্রার ব্যয়

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ ইতোমধ্যেই বাড়তির দিকে রয়েছে। এরই মধ্যে আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি ও খুচরা উভয়পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১.২০ থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, আর খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক ধাপে ধাপে ভিন্ন হারে মূল্য বাড়ানো হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ ইতোমধ্যেই বাড়তির দিকে রয়েছে। এরই মধ্যে আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি ও খুচরা উভয়পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১.২০ থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, আর খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক ধাপে ধাপে ভিন্ন হারে মূল্য বাড়ানো হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবহন, উৎপাদন ও সেবা খাতে এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হলে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রস্তাবের কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া

পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সাধারণত বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসিতে জমা দেয়, এরপর কমিশন গণশুনানি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এবারো সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) অন্যান্য বিতরণ কোম্পানি তাদের নিজ নিজ প্রস্তাব চূড়ান্ত করছে। চলতি সপ্তাহেই এসব প্রস্তাব বিইআরসিতে জমা পড়তে পারে। গণশুনানি শেষে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের শুরুতেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হতে পারে।

খুচরা পর্যায়ে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি

খুচরা পর্যায়ে প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি ব্যবহারভিত্তিক ধাপ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তে পারে প্রায় ৭০ পয়সা। তবে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের (লাইফলাইন গ্রাহক) আপাতত এই বাড়তি চাপ থেকে মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহক সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় পড়তে পারেন। বাকি ৬৩ শতাংশ, যারা স্বল্প ব্যবহারকারী, তারা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারেন। তবে বাস্তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সব শ্রেণীর মানুষের ওপর পড়বে।

ভর্তুকির চাপ ও আর্থিক ঘাটতি

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ হচ্ছে, তা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় গড়ে প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই বিশাল ব্যবধান পূরণ করতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত আরো ১৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। যদিও সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে, তবুও ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- আমদানিনির্ভর জ্বালানি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশই আমদানিকৃত। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দ্বিতীয় অন্যতম কারণ হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী তাদের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও অর্থ ব্যয় অব্যাহত থাকে। মেঘনাঘাট, আরপিসিএল-নোরিনকো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো এই ব্যয় বাড়াচ্ছে। তৃতীয় কারণ হলো অবকাঠামোগত অদক্ষতা। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় অদক্ষতা ও অপচয়ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কাজ করছে।

মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুতের দামের সম্পর্ক

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো শুধু একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পেলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮.৭১ শতাংশ। খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ ইতোমধ্যেই বাড়তির দিকে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবহন, উৎপাদন ও সেবা খাতে এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প ও বাণিজ্য খাতে প্রভাব

বিদ্যুতের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে শিল্প খাতে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে- রফতানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়লে দোকানপাট, শপিংমল, অফিসসহ বিভিন্ন সেবা খাতেও খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ হিসেবে ফিরে আসবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব, যদিও লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত মূল্যবৃদ্ধির বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, তবুও বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে। কারণ-পণ্যের দাম বাড়বে পরিবহন খরচ বাড়বে। এতে ভাড়া ও অন্যান্য সেবার খরচ বাড়তে পারে অর্থাৎ সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সব শ্রেণীর মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে।

সরকারের নীতিগত অবস্থান

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকার অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই বিদ্যুৎ বিভাগ বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি কমাতে এবং আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা জরুরি। অন্যথায় বাজেটের ওপর চাপ আরো বাড়বে এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয় সঙ্কুচিত হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকির চাপ কমাতে সহায়তা করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে। তারা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন- উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা তাদের মতে, শুধু দাম বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এক দিকে ভর্তুকির বাড়তি চাপ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম সমন্বয় প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, অন্য দিকে এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার খরচ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সরকারকে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে এক দিকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এর জন্য শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।