নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। আওয়ামী আমলে বহু প্রচারণা চালিয়ে ২০২২ সাল থেকে নতুন এবং বিতর্কিত একটি কারিকুলাম শিক্ষার্থীদের ওপরে চাপিয়ে দেয়া হলেও অভিভাবক ও অধিকাংশ শিক্ষকের প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি সফল হতে পারেনি। যদিও ২০২৭ সাল থেকে নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সেটিও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পরে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরেই নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এতে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষের আগে কারিকুলাম প্রস্তুত এবং সেটি বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার সুবাধে তাদের নিজেদের মতো করে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিতর্কিত একটি কারিকুলাম চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করেছিল। ২০২১ সালের পর থেকেই সরকারি চাপ এবং বিদেশী চক্রের কূটকৌশলের কারণে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণীতে বহু বিতর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যসূচি তৈরি করা হয়। তবে ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বিতর্কিত সব বিষয় বাতিল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা দিয়ে ২০১২ সালের কারিকুলামে ফিরে যায়। একই সাথে আগের বইয়ের বিভিন্ন প্রশ্নবোধক বিষয় বাদ দিয়ে নতুনভাবে সাজানো হয় শিক্ষাক্রম।
এ দিকে এনসিটিবি সূত্র জানায়, সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই সময়ে নতুন করে কোনো কারিকুলাম প্রস্তুতের কাজ শুরু করা ঠিক হবে না। কেননা নির্বাচিত প্রত্যেক সরকারেরই নিজস্ব একটি প্ল্যান থাকে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আগামীতে যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা চাইবে তাদের চিন্তাধারা কিংবা নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা থাকলে সেটি সেই সরকারের বিবেচনায় নিয়ে সেভাবেই শিক্ষা সংস্কার কিংবা শিক্ষা কাঠামো সাজানোর। তাই নির্বাচন যেহেতু একেবারেই দোরগোরায় চলে এসেছে, কাজেই কারিকুলাম প্রস্তুতের কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে কারিকুলাম প্রস্তুতের আগের ফ্রেমওয়ার্ক বা কাজের পরিকল্পনার জন্য কিছু কাজ এগিয়ে রাখা হবে। বর্তমানে যেহেতু এনসিটিবির সব কর্মকর্তা পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও তদারকির কাজে ব্যস্ত। তাই আগামী ২০ জানুয়ারির পরেই এ বিষয়ে কিছু কাজ শুরু করা হবে।
সূত্র জানায় ২০২৭ সাল থেকে প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা নিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু শিক্ষা কমিশন গঠন ও শিক্ষানীতি চূড়ান্ত না করে নতুন কারিকুলামের দিকে গেলে সেটাও ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে পাইলটিং প্রক্রিয়ায় যাবে কি না সেটা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে খোদ এনসিটিবি। অবশ্য একটি দেশের শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে কারিকুলামকে বলা হয় ঐ শিক্ষার সংবিধান। সংবিধান দিয়ে যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা হয়, তেমনি কারিকুলামকে ঘিরে চলে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। আগামী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে উঠবে তার পুরো রূপরেখা থাকে সেখানে।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের কারিকুলাম পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সে সরকারই তার দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এ শিক্ষাকে। ফলে বহুমুখী শিক্ষায় কাক্সিক্ষত দক্ষ জনগোষ্ঠীও তৈরিতে রয়ে গেছে দুর্বলতা। সব শেষ পতিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত শিক্ষাক্রমে যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সক্ষমতা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সম্পূর্ণ নতুন একটি কারিকুলাম চাপিয়ে দেয়া হয়। দিনশেষে লেজেগোবরে অবস্থায় ব্যর্থ হয় সেই অপরিকল্পিত কারিকুলাম।
দেশের অসংখ্য অভিভাবক এবং বহু শিক্ষক নিজেরাই আওয়ামী আমলের সেই বিতর্কিত কারিকুলামের বিরোধিতা করেছিলেন। অনেক অভিভাবক রাজপথে নেমেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিয়ে সেই কারিকুলাম বাতিল করে ফিরে যায় ২০১২ সালের পাঠক্রমে। পরবর্তীতে এই সরকার ২০২৭ সাল থেকে শ্রেণিকক্ষে আবারো নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নেয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও কেনিয়ার কারিকুলাম পর্যালোচনা করছে এনসিটিবি। কিন্তু সেই নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের কাজ ত্রয়োদশ নির্বাচনের ডামাডোলে স্থগিত হয়ে গেছে।
এনসিটিবি প্রধান সম্পাদক (অতিরিক্ত দায়িত্ব কারিকুলাম) অধ্যাপক ফাতিহুল কাদীর সম্রাট নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেককে জানান, একটি নতুন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কিভাবে তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজাবেন। জাতীয় নির্বাচন যেহেতু অত্যাসন্ন তাই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরেই তাদের ইচ্ছা পরিকল্পনা এবং দূরদৃষ্টির আলোকে অবশ্যই দেশের শিক্ষা কাঠামোকেও সেই আলোকে সাজাবেন। তাই আপাতত কারিকুলামের কাজ হচ্ছে না। তবে কারিকুলাম প্রস্তুতের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ করা দরকার সেটি চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। আর আগামী ২০ জানুয়ারির পর থেকে কারিকুলাম বিষয়ে আরো কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে কারিকুলাম প্রণয়নে অনেক বিষয় বিবেচনায় নেয়া দরকার। যেমন প্রাথমিক শিক্ষা কোন পর্যন্ত থাকবে, কী শেখানো হবে না হবে- এসব বিষয়ে পুরো নির্দেশনা থাকবে শিক্ষা নীতিতে। এ জিনিসগুলো করার জন্য সবার আগে দরকার হলো একটি শিক্ষা কমিশন। আবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে কারিকুলাম তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন অনেক শিক্ষাবিদ। তড়িঘড়ি নয়, সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০২৮ এ নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
শিক্ষা গবেষক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একটি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। বেসিক কতগুলো বিষয়, যে বিষয়গুলো সবাই পড়বে। যেমন কওমি মাদরাসার একটি বিষয় যেমন থাকবে, তেমনি আমাদের জাতীয় কারিকুলামের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ওখানে পড়ানো হবে । অতীতের মতো কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বারবার পাঠক্রম পরিবর্তনে শিক্ষার মান নিচের দিকেই নামছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



