বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ড সভায় বিষয়টির অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে আভাস মিলেছে, যদিও দরকষাকষি সংক্রান্ত তথ্যে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী আফ্রন মানি (চুক্তি মূল্য) নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ মিলিয়ন ডলার, তবে হ্যান্ডলিং চার্জসহ মোট আয় বর্তমান আয়ের সমান হবে কি না, তা নিয়ে বন্দর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক ১৫ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং সক্ষমতাসম্পন্ন এনসিটিতে বর্তমানে প্রতি কনটেইনার এককে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিট আয় ৯৭ ডলার। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ডের সর্বশেষ প্রস্তাবিত রাজস্ব ভাগাভাগি মডেলে আফ্রন মানি ও হ্যান্ডলিং চার্জ মিলিয়ে এই আয় বজায় থাকবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেয়া প্রস্তাবে সর্বোচ্চ আয় ছিল ৮৫ ডলার পর্যন্ত। সেই সময় ইয়ার্ড বরাদ্দ, চুক্তির মেয়াদ ও জেটি বণ্টন নিয়ে দ্বিমতের কারণে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ওই প্রস্তাবে সম্মত হননি।
সাত বছর আগে স্বাক্ষরিত সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) সমঝোতা স্মারকের আওতায় টার্মিনালটি ইজারার আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে কনসেশন চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছরের পরিবর্তে ৩০ বছর করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া দুবাইয়ের শ্রমবাজার এবং সেখানে বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হ্যান্ডলিং চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। টার্মিনালটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিদেশী অপারেটরের হাতে যাওয়ার পর দেশের নিরাপত্তা যাতে ঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে চুক্তিতে শর্ত যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে এনসিটির মাধ্যমে বছরে ১৩ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৩৩ শতাংশ। লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ডলার সঙ্কট মোকাবেলার লক্ষ্যে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে চট্টগ্রাম বন্দরের বেটার্মিনালসহ বন্দর খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে পিপিপি জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটক বাংলাদেশীদের মুক্তির বিষয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা আমিরাতের শাসকের সাথে টেলিফোনে কথা বলার পর এনসিটি ইস্যুতে ডিপি ওয়ার্ল্ড আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরপরই ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দেন। সেই বৈঠকে সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি দুবাইয়ের শ্রমবাজার ও সেখানে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ শ্রমিকের প্রসঙ্গও তোলা হয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলমান রয়েছে। বোর্ড সভায় বিষয়টি অনুমোদন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।



