নিজস্ব প্রতিবেদক
- দুর্ঘটনার কারণে বৈঠক স্থগিত
- বিমান দুর্ঘটনায় সবাইকে হতাহতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান সালাহউদ্দিনের
- নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জামায়াতের
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ, অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান, রক্তপাত এবং হাজারো প্রাণনাশের কথা বিবেচনায় রেখে সামনে অগ্রসর হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সেখান থেকে পেছানোর কোনো উপায় নেই। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সেই বিবেচনায় আমরা চাই, আগামী ১০ দিনের মতো সময় আছে। এর মধ্যে একটা ঐকমত্যে আসতে। হয়তো এক-দুই দিন বিশেষ বিবেচনায় বাড়িয়ে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু আজসহ আমাদের হাতে থাকা ১০ দিনের মধ্যে বাকি বিষয়গুলোতে আমাদের সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের ১৬তম দিনের বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমরা মুক্তিযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। তার জন্য লাখ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। শুধু এক দিনের সংগ্রাম, একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়েই সেটি হয়নি। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা সেই জায়গায় এসেছি, রাষ্ট্র অর্জন করেছি।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময় ৫৩ বছর ধরে আমরা গণতন্ত্রের সংগ্রাম করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি, একটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। সেই সংগ্রাম অব্যাহত আছে। তারই একপর্যায়ে আমরা ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের শাসনে নিপতিত হয়েছিলাম। সেখান থেকে সব রকম ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাই মিলে সব মতপার্থক্য ভুলে একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আজকের এই জায়গায় এসেছি।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৬তম দিনের আলোচনা চলছিল। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান ছিল আলোচ্যসূচিতে। সকালে বিষয় দু’টি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এরই মধ্যে দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমানের দুর্ঘটনার খবর আসে। দুর্ঘটনার পরপরই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ শোকবার্তা পাঠ করেন এবং নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয় এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। কমিশনের সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নেন। পরবর্তীতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিহত ও আহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অধিবেশন দিনের বাকি সময়ের জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হয়। এতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
এ সময় কমিশনের সদস্য হিসেবে বিচারপতি মো: এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো: আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৭তম দিনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
সবাইকে বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান সালাহউদ্দিনের : জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ রাজধানীর উত্তরায় মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আজ আমাদের জন্য একটা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দিন। আমরা যতটুকুু সংবাদ পেয়েছি, বিমানের পাইলটসহ মাইলস্টোন স্কুুলে বিমানটি নিপতিত হয়েছে। যেহেতু স্কুল, স্বাভাবিকভাবেই এখানে অনেক ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকরাও ছিলেন। অসংখ্য হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং দুঃখজনক ঘটনা।
শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ঘটনার ব্যাপারে তদন্ত হবে। তারপর হয়তো আমরা কারণগুলো জানতে পারব। আমরা সবাই শোকাহত। এ ধরনের ঘটনা যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই কামনা করি। এ ধরনের একটি দুর্ঘটনায় যারা হতাহত হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব রাজনৈতিক দল ও শ্রেণিপেশার মানুষকে আহ্বান জানাই। আমরা নিজেরাও যা কিছু সহযোগিতার প্রয়োজন তা করব।
নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জামায়াতের : রাজধানীর দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক মুলতবির পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ দাবি জানান। নিহতদের রূহের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী দুর্ঘটনায় নিহতরা শাহাদতের মর্যাদা পান। তিনি সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিহতদের পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। এ সময় অপর সহকারী সেক্রেটারি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ উপস্থিত ছিলেন।
অবিলম্বে জুলাই সনদের খসড়া উপস্থাপনের আহ্বান এবি পার্টির : অবিলম্বে জুলাই সনদের খসড়া উপস্থাপনের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি একই সাথে দলীয় প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা যাতে হতে না পারেন সে বিষয়ে সংবিধানে নীতি প্রণয়ন করার প্রস্তাবকে সমর্থন জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয়করণ কিভাবে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তা আমরা অতীতে বহুবার দেখেছি। গণভবনে রাষ্ট্রীয় পদ ব্যবহার করে দলের সম্মেলন অনুষ্ঠান করা ও বিভিন্ন জেলা সফরে গেলে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ব্যবহারের কারণে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হয়, যা বৈষম্যের নামান্তর।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈঠকের মাঝে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। মঞ্জু বলেন, বিএনপি উপস্থাপিত ৩১ দফার চতুর্থ পয়েন্টে আইনসভা, মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার সাথে এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, যতটুকু আলোচনা হয়েছে সন্তোষজনক। তাই অবিলম্বে জুলাই সনদের খসড়া উপস্থাপন করতে হবে।



