নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামে ‘নির্বাচনী দায়িত্বশীল সম্মেলন’-এ দেয়া বিতর্কিত বক্তব্যের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
২৪ নভেম্বর দলীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত নোটিশে জানানো হয়, ২২ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে শাহজাহান চৌধুরী এমন বক্তব্য দেন, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, অনুষ্ঠানস্থলে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন শুধু জনগণ দিয়ে নয়, যার যার নির্বাচনী এলাকায় প্রশাসনে যারা আছে, তাদের সবাইকে আমাদের আন্ডারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কথায় উঠবে, আমাদের কথায় বসবে, আমাদের কথায় গ্রেফতার করবে, আমাদের কথায় মামলা করবে।’
এই বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
কারণ দর্শানোর নোটিশে জামায়াত জানায়, এ ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও কার্যক্রমকে ব্যাহত করে এবং তা দলটির গঠনতন্ত্র, নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলার সাথে সাংঘর্ষিক।
নোটিশে আরো বলা হয়, শাহজাহান চৌধুরী পূর্বেও এমন বক্তব্য দিয়ে সংগঠনের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করেছেন, যার কারণে তাকে একাধিকবার সতর্কও করা হয়েছিল। এমনকি জামায়াতের আমিরও তাকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছিলেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশ-বিদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া : দলীয় নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই বক্তব্য দেয়ার পর- প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কূটনৈতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে, দেশ-বিদেশে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ফলে দলটির সুনাম ও ভাবমর্যাদা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
৭ দিনের আলটিমেটাম : দলীয় আমিরের নির্দেশে নোটিশে শাহজাহান চৌধুরীকে আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়- যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না দেয়া হয়, তাহলে দলীয় গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবাদ : সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর সাম্প্রতিক এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
সোমবার রাতে দেয়া পৃথক বিবৃতিতে দুই সংগঠনই জানায়, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে যে ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে, তা সংবিধানবিরোধী, অবমাননাকর এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন : বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায়, এ ধরনের বক্তব্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি চরম অসম্মানসূচক।
সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশ পুলিশ সংবিধান ও আইনের আলোকে পরিচালিত হয়। অতীতে কিছু উচ্চাকাক্সক্ষী সদস্য রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে পুলিশের সাথে জনগণের দূরত্ব তৈরি করেছিল। তবে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
তারা আরো উল্লেখ করে, পুলিশ বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য : বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন তাদের বিবৃতিতে শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যকে পুলিশের প্রতি অপমানজনক, মানহানিকর এবং পেশাদারিত্বকে অবমাননাকর হিসেবে অভিহিত করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশকে কারো ‘কথায় ওঠা-বসা করা’ এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচনকালীন শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বিপন্ন করতে পারে।
দুই পুলিশ সংগঠন শাহজাহান চৌধুরীর কাছে তিনটি স্পষ্ট দাবি জানিয়েছে, অবিলম্বে প্রকাশ্যভাবে বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। পুলিশের প্রতি মানহানিকর মন্তব্যের জন্য জনসম্মুখে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে।
ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক নেতা যেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য না দেন-এ আহ্বান জানানো হয়।
দুই সংগঠন একযোগে জানায়- বাংলাদেশ পুলিশ সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রীয় শপথের প্রতি অটল। এ ধরনের বক্তব্য শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি।
শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্য : গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাহজাহান চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার বক্তব্যে যদি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এবং ভুলত্রুটি হয়ে থাকে তার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি।
শোকজ সম্পর্কে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সংগঠন। আমিসহ যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে সংগঠন যেকোনো ধরনের কারণদর্শানোর নোটিশ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। এই অধিকার সংগঠনের আছে।



