জরিপে তথ্য

বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে

আবুল কালাম
Printed Edition

দেশে নারী সুরক্ষায় কঠোর আইন থাকলেও থামছে না সহিংসতা, বৈষম্য, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির ঘটনা। আইন প্রয়োগে প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে নারীদের প্রতি সহিংসতা আরো বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। প্রচলিত বহু আইন ও নীতিমালায় নারীর অধিকার এবং নারী-পুরুষ সমতার বিষয় থাকলেও বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদসহ নানা পেশায় নারীরা এগিয়ে গেলেও হয়রানি, হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহননসহ নানা প্রতিকূলতা তাদের অগ্রযাত্রা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগে ধীরগতি, দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা অপরাধপ্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। ফলে নারীদের সুরক্ষায় আইনের সঠিক প্রয়োগ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে নারী নির্যাতন নিয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে দেশে দুই হাজার ৮০৮ নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদ ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য প্রকাশ করে।

তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকারদের মধ্যে এক হাজার ২৩৪ জন কন্যাশিশু এবং এক হাজার ৫৭৪ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে। গত বছরে মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা এবং ২৪৩ জন নারী।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ নারী নির্যাতন জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০ শতাংশের বেশি নারী ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পরিসংখ্যান শুধু গৃহস্থালি সহিংসতার ভয়াবহতা নয়, নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন ও জনসমক্ষে হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন এবং নির্যাতন মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের জরুরি প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশে নারী নির্যাতনের ধরন পাল্টেছে। দ্রুত বাড়ছে সাইবার সহিংসতা। বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেয়া, অযাচিত অন্তরঙ্গ বার্তা পাঠানো, ব্ল্যাকমেইল এবং অপমানজনক কনটেন্ট ছড়ানোর মাধ্যমে নারীদের হয়রানি করা হচ্ছে। বিবিএস ও ইউএনএফপিএ প্রকাশিত জরিপে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ও কন্যা কোনো না কোনো ধরনের জেন্ডারভিত্তিক সাইবার সহিংসতার শিকার।

কখনো যৌন প্রতারণা, কখনো সুনাম নষ্টের অপচেষ্টা, আবার কখনো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাসহ নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলে নারীরা নিগ্রহ ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। ভার্চ্যুয়াল জগতের এসব ঘটনা তাদের বাস্তব জীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অগ্রগতি ব্যাহত করছে।

এ বিষয়ে নারী অধিকার আন্দোলনের সভানেত্রী ও সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ডিভিশন চিফ মমতাজ মান্নান বলেন, বহুদিন ধরে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন চলে আসছে। বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায় এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন, সহিংসতা শুধু নারীর অগ্রগতিই রুদ্ধ করে না, সামগ্রিকভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত করে। নারীর অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন, তেমনি ঘরে ও বাইরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

নিগ্রহ, ধর্ষণসহ অপরাধ মোকাবেলায় আইনের প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা না হলে দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী-যারা নারী মূলধারায় অংশগ্রহণ থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, নারী শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, সামাজিক পরিসরের সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীরা অংশ নিচ্ছেন না, কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই তারা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। নারীর প্রতি ব্যবহৃত ভাষা ও আচরণও অনেক ক্ষেত্রে মর্যাদাহানিকর ও বর্বরতাপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা কমার বদলে বরং বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা নেই, কোথাও থাকলেও কার্যকর নয়। তার মতে, নারীর অগ্রগতির সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র সমানভাবে পাশে দাঁড়াতে না পারা, সমতার দৃষ্টিভঙ্গির অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা বৃদ্ধির বড় কারণ। যা নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।