কোটা সংস্কারের দাবিতে ১১ জুলাই টানা চতুর্থ দিনের মতো ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এ দিন বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়েন তারা। আন্দোলনকারীরা শাহবাগ থেকে বাংলামোটরগামী সড়কে দফায় দফায় মিছিল করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। এ দিন রাজধানীর নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব ও আগারগাঁওসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশ বাধা দেয়। রাজধানীর বাইরে দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ।
ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগে শিক্ষার্থীরা; সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে উল্লাস : রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে উল্লাস করেন কোটাবিরোধীরা। এ দিকে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলা ও বাধার প্রতিবাদে সারা দেশে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশ সাঁজোয়া যান ও জলকামান নিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিকেল থেকে শাহবাগ, বাংলামোটর, হাইকোর্টে, নীলক্ষেতসহ রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। আমরা চাই সরকারের নির্বাহী বিভাগ একটি কমিশন গঠন করে কোটার যৌক্তিক সংস্করণ করুক।
এ দিন কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়ে রাতে শাহবাগ থেকে অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন, আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাব, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনুন।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, হাইকোর্টের আংশিক রায়ে বলা হয়েছে, সরকার চাইলে কোটার সংস্কার করতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে শেকৃবিতে কেন লাঠিচার্জ করা হলো? শাবিপ্রবিতে হামলা করা হয়েছে, চবিতে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ হামলা করেছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়েছে।
শাহবাগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টায় শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও গুলিস্তানে পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগে আসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী স্বর্ণা রহমান বলেন, কোনো বাধা আমাদের আটকাতে পারবে না। দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরব।
নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবে পুলিশি বাধা : ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড় এবং নীলক্ষেত মোড়ে গেলে পুলিশের বাধায় কোথাও বসতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে যাত্রা করেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না করার আহ্বান পুলিশের : তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালত থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা শিক্ষার্থীদের পক্ষে রয়েছে।
সারা দেশে বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিপেঠা : রাজধানীর বাইরেও দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ।
কুমিল্লায় পুলিশের লাঠিপেটায় আহত ২৬ : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করতে গেলে আনসার ক্যাম্পাসসংলগ্ন স্থানে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকবার ধাওয়া দেয় হয়। পরে আবাসিক হল ও মেসের প্রায় ৭০০-৮০০ শিক্ষার্থী এসে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে অগ্রসর হতে চেষ্টা করেন। তখন পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ করে। পরে শটগান দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলির পাশাপাশি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ও পাথর নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ২৬ শিক্ষার্থী আহত হন। থেমে থেমে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ সরে যেতে বাধ্য হয়।
চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ : চট্টগ্রামের বটতলী রেলস্টেশনে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা রেললাইন অবরোধের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে পুলিশ রেললাইন থেকে তাদের সরিয়ে দেয়। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টাইগারপাস এলাকায় সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ তাদের পথরোধ করে। বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেট এলাকায় অবস্থান নিলে ফের লাঠিচার্জ করে পুলিশ। নগরীতে লাঠিচার্জের খবরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা এক নম্বর গেটে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে জড়ো হতে থাকেন। এ দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তারা নগরী থেকে উত্তর চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি যাওয়ার সড়কটি অবরোধ করেন।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জাবি শিক্ষার্থীরা : পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক তিন ঘণ্টা অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। বেলা আড়াইটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন মহাসড়কে অবস্থান নেন সাভার হাইওয়ে থানা এবং আশুলিয়া থানা পুলিশের শতাধিক সদস্য। বেলা সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা।
রাজশাহীতে রেলপথ অবরোধ কুবি শিক্ষার্থীদের : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রেলপথ অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে রাজশাহীর সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
ইবিতে পুলিশের বাধা উপেক্ষা : বিকেল ৪টায় কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের বটতলা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রধান ফটকে গেলে বাধা দেয় পুলিশ। পরে বাধা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে শেখপাড়া বাজার ঘুরে এসে প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে অবস্থান নেন আন্দোলনরতরা।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ : বিকেল পৌনে ৪টায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) গেটে শিক্ষার্থীদের বাধা দেয় পুলিশ। বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন।



