স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভাবছে না আ’লীগ

ব্যালটে নৌকা প্রতীক না থাকলে দলীয় প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার সম্ভাবনা

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

দলীয়ভাবে আপাতত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে ভাবছে না পতিত আওয়ামী লীগ। অবশ্য স্থানীয়ভাবে ক্লিন ইমেজের দল সমর্থিত প্রার্থীদের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সব কিছু নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, এক মাসও হয়নি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় হয়েছে- সেখানে আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা হলেও একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে কতটুকু সুযোগ দিবে বা আদৌ দিবে কি না এটা নিয়ে দল ও সরকারের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার বিষয় রয়েছে। বিষয়টা নিয়ে দলীয়ভাবে এখনো পর্যবেক্ষণ চলছে। মোট কথা, নতুন সরকারের মনোভাবের ওপর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরা না ফেরা অনেকটা নির্ভর করছে। যদিও নির্বাচনের পর বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলতে দেখা গেছে। সেগুলোর মধ্যে আবার স্থানীয় নানা চাপে কোনো কোনোটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ করছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।

দলটির নেতারা মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার এক আদেশে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সেটা মানেনি। কিন্তু এটাওতো একটা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দরুন গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। গেল নির্বাচনের ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকও ছিল না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও প্রতীকে অংশগ্রহণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ব্যালটে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার মারপ্যাচে পড়ে এমনিতেই আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তা ছাড়া দলীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে স্থানীয় সরকারের যেকোনো পর্যায়ের হোক- নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করারও সুযোগ থাকবে না।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের মন্ত্রিপরিষদ, দলীয় এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কেউ দেশ ছাড়েন এবং কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যান। এর পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা দুয়েকটা ঝটিকা মিছিল ছাড়া প্রকাশ্যে কাউকেই দেখা যায়নি। এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও তৃণমূল পর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীরা শেষমেশ বিএনপির প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ‘নো বোট, নো ভোট’ ক্যাম্পেইনে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে সোচ্চার ছিলেন। শেষ সময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভোটদানে বিরত রাখতে পারেনি পতিত আওয়ামী লীগ।

এ দিকে নির্বাচনের পর পরই জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়ি, পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা কার্যালয়, খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ কার্যালয়, শরীয়তপুরের পালং বাজারে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ আরো কয়েকটি জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে নেতাকর্মীরা প্রবেশ করেন। যদিও কিছু জায়গায় স্থানীয় নানা চাপে খুলে দেয়ার পর কার্যালয় ফের বন্ধ করা হয়েছে। যদিও এসব কার্যালয় খোলাটা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের জন্য ছিল এসিড টেস্ট। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধারণার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না বা দেশের মানুষ নতুন করে আওয়ামী লীগকে কিভাবে গ্রহণ করে বা আদৌ গ্রহণ করে কি না এসব বিষয়ে মতামত বোঝার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

যদিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের নিয়ে গঠিত নতুন দল এনসিপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গত ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ চালাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন আওয়ামী সমর্থিতরা। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে সরকারের অনুসমর্থন প্রয়োজন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ। দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে থাকা মধ্যম সারির ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও এমনটি মনে করেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগকে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে অবশ্যই সরকারের তরফ থেকে রাজনৈতিক সহনশীল বার্তা থাকতে হবে। সরকারের অনুসমর্থন থাকলেই কেবল বিরোধী দলে যারা রয়েছেন তারাও সহনশীল আচরণ করতে পারে। এমন প্রেক্ষাপট তৈরি না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।