সড়ক ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় গাফিলতিতে বাড়ছে দুর্ঘটনা

ঈদযাত্রায় ২০১ সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জন নিহত

এস এম মিন্টু
Printed Edition

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মুহূর্তেই আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির খসড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের ঈদের ছুটিতে এ পর্যন্ত ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৪২১ জন। ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬২১ জন। তাদের মধ্যে ১৭৮ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও ৩১৫ জন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনার রোগী।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদের ছুটির ৭ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন মারা গেছেন। সরকারি হিসাবে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। অন্য দিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাবে একই সময়ে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সরকারি তালিকায় অনেক দুর্ঘটনা অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিংয়ে বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সরকারি তালিকায় নেই।

সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে অসাবধানতা, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, বাস রুট রেশনালাইজেশন, টার্মিনাল আধুনিকায়ন এবং সঠিক তদারকি ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। ঈদে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও শ্বশুরকে নিয়ে বাড়িতে আনন্দ উদযাপনের কথা ছিল সোহেলের। কিন্তু সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীবাহী দুই লঞ্চের চাপায় পরিবারটির স্বপ্ন পিশে গেছে। সড়ক পথে নানা অব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক ও অতিরিক্ত সময় চালনা- এসব অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ঈদে ঘরমুখো মানুষ।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঈদযাত্রায় শুধু সড়ক পথেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩২২ জন। এবারের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রেলযাত্রা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হওয়ার কথা। কিন্তু বগুড়ার আদমদীঘির বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার দুর্ঘটনা এবং কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ ড. এম হাদিউজ্জামান বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, বাস রুট রেশনালাইজেশন, টার্মিনাল আধুনিকায়ন এবং সঠিক তদারকি না হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। সদরঘাট টার্মিনালকে ঢেলে সাজানো না হলে ধাক্কাধাক্কি বা গ্যাংওয়ের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আমাদের পদ্ধতিকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে মানুষ ভুল করলেও জীবন বাঁচে। ঈদযাত্রায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

মোজাম্মেল হক, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব, বলেন, দুর্ঘটনা বাড়ার মূল কারণ হলো সড়কের অব্যবস্থাপনা, গাফিলতি, যানবাহনের ত্রুটি এবং আইন প্রয়োগের ঘাটতি। ছোট যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেছে, বড় যানবাহনের ব্যবহার কমে গেছে, যার ফলে সড়কের সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তিনি যোগ করেন, ‘কারিগরি ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা সমাধানযোগ্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্ঘটনা কমিয়েছে, আমাদের দেশেও তা প্রয়োগ করা দরকার।’

অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহ থাকলেও রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শক্ত উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা রেখে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। কুমিল্লার রেললাইনে বাসের ওপর ট্রেন ওঠার ঘটনাই দেশের রেল ক্রসিংয়ের অরক্ষিত অবস্থার উদাহরণ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দায়িত্বরত গেটম্যানের অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেশে প্রায় ৩ হাজার রেল ক্রসিংয়ের অর্ধেকের অনুমোদন নেই এবং ৮০ শতাংশে স্থায়ী পাহারাদার নেই।

কাজী সাইফুন নেওয়াজ, যোগাযোগব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ, বলেন, ‘মহাসড়কে রেল ক্রসিং থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবেই। উড়ালসেতু বা অটোমেটেড রেলগেট ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায় না। গত এক দশকে রেলের উন্নয়নে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, কিন্তু অটোমেশনে বিনিয়োগ হয়নি। এর ফলে রেল এবং সড়ক উভয় ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঝুঁকি বহাল আছে। এটি দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা।’ তিনি আরো বলেন, ‘সড়কে লাখ লাখ আনফিট যানবাহন চলছে, চালকের অভাব, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। ঈদের সময়ে সড়ক-মহাসড়কে পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। রেলেও অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন দেখা গেছে। ঈদের পরে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।’

বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন, সড়কে হতাহতের জন্য একক কোনো পক্ষ দায়ী নয়। এটি চালক, কর্তৃপক্ষ ও পথচারী- সবার সম্মিলিত গাফিলতির ফলাফল। ভাঙা রাস্তা, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, চালকের বেপরোয়া মনোভাব, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার নিয়োগ, অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া পথচারীর অসচেতনতা- ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্যও জীবন ঝুঁকিতে ফেলে।