মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স থেকে
ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর আরাস এমন একটি নগর, যেখানে মধ্যযুগীয় স্থাপত্য, সামরিক ইতিহাস, দুই বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি এবং আধুনিক নগরজীবন একে অপরের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। পা-দ্য-কালে অঞ্চলের এই শহরটি বহু শতাব্দী ধরে উত্তর ফ্রান্সের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সামরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আজ আরাস শুধু তার সৌন্দর্য, বড়দিনের বিখ্যাত বাজার কিংবা গ্রীষ্মকালীন সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য পরিচিত নয়; শহরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃত। বিশেষ করে এর বেলফ্রি, ভোবাঁর দুর্গনির্মাণ ঐতিহ্য এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সমাধিক্ষেত্র ও স্মৃতিসৌধ আরাসকে ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যনগরে পরিণত করেছে।
আরাসের ইতিহাস বহু পুরনো। রোমান যুগে এই অঞ্চল ছিল গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি ও বাণিজ্যকেন্দ্র। মধ্যযুগে শহরটি বস্ত্রশিল্প, বাণিজ্য এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের জন্য খ্যাতি অর্জন করে। শহরের সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন দেখা যায় এর ঐতিহাসিক চত্বর, গির্জা, নাগরিক স্থাপনা এবং অলঙ্কৃত ভবনগুলোর স্থাপত্যে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কারণে শহরটি বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিবারই নতুন রূপে পুনর্গঠিত হয়েছে। এই পুনর্গঠনের ধারাই আজকের আরাসের স্থাপত্য ও নগরচরিত্রকে এত বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
আরাসের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি হলো এর ঐতিহাসিক বেলফ্রি বা ঘণ্টাধ্বনি টাওয়ার। প্রায় ৭৫ মিটার উঁচু এই স্থাপনাটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং বহু শতাব্দী ধরে আরাসের নাগরিক পরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
বেলফ্রিটির স্থাপত্যে গথিক ঐতিহ্যের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে যুদ্ধ, ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের ফলে এর বর্তমান রূপে বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় ঘটেছে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর পুনর্নির্মাণের সময় এতে আর্ট ডেকো প্রভাব যুক্ত হয়। ফলে স্থাপনাটি একই সাথে মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক পুনর্গঠনের ইতিহাস বহন করে। এর শীর্ষে স্থাপিত সিংহের ভাস্কর্যও আরাসের প্রতীকী পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০০৫ সালে বেলফ্রি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। উত্তর ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বেলফ্রির সমষ্টিগত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আরাসের বেলফ্রি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি স্থাপনাকে মর্যাদা দেয়নি; বরং মধ্যযুগীয় নগরজীবন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
বেলফ্রির চারপাশের গ্রঁ-প্লাস এবং প্লাস দে হেরো-সহ আরাসের ঐতিহাসিক চত্বরগুলো শহরের আরেকটি বড় আকর্ষণ। বিস্তৃত চত্বরের চারপাশে সারিবদ্ধ ঐতিহাসিক ভবনগুলোর সম্মুখভাগে অলঙ্করণ, খিলান, কারুকার্য ও বিভিন্ন রঙের ব্যবহার শহরের একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্যিক চরিত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে বারোক ও ফ্লেমিশ স্থাপত্যের প্রভাব আরাসের ঐতিহাসিক কেন্দ্রকে উত্তর ফ্রান্সের অন্যান্য শহর থেকে আলাদা করে তোলে। বছরের বিভিন্ন সময়ে এই চত্বরগুলোতে বাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শীতকালে বড়দিনের বাজার শহরটির কেন্দ্রকে আলোকসজ্জা, কাঠের দোকান, খাবার ও উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তোলে।
আরাসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইউনেস্কো ঐতিহ্য হলো ভোবাঁর নির্মিত দুর্গ বা সিটাডেল। সপ্তদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে সামরিক প্রকৌশলী সেবাস্তিয়াঁ ল্য প্রেত্র দ্য ভোবাঁ ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার পরিকল্পনায় নির্মিত দুর্গগুলো ইউরোপীয় সামরিক স্থাপত্যের ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে। আরাসের সিটাডেলও সেই বৃহত্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ।
১৬৬৮ থেকে ১৬৭২ সালের মধ্যে নির্মিত আরাসের সিটাডেল ছিল একটি পরিকল্পিত সামরিক দুর্গ। এর নকশায় প্রতিরক্ষার জন্য জ্যামিতিক বিন্যাস, পুরু প্রাচীর, পরিখা এবং আক্রমণ প্রতিহত করার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। পাঁচ কোণবিশিষ্ট দুর্গের বিন্যাস ভোবাঁর সামরিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে।
বর্তমানে আরাসের সিটাডেল আর কেবল একটি সামরিক স্থাপনা নয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর আশপাশের এলাকা একটি আধুনিক নগরাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে। পুরনো দুর্গপ্রাচীর ও সবুজ পরিবেশের সাথে আবাসিক এলাকা, ব্যবসা, শিক্ষা ও বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। ফলে ইতিহাস সংরক্ষণ এবং আধুনিক নগরজীবনের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। দুর্গের পরিবেশে সবুজ এলাকা ও হাঁটার পথও রয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় স্থান করে তুলেছে।
সিটাডেলের সাংস্কৃতিক গুরুত্বের আরেকটি দিক হলো এখানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান। বিশেষ করে ‘মেইন স্কয়ার ফেস্টিভাল’ বা গধরহ ঝয়ঁধৎব ঋবংঃরাধষ-এর মতো বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন আরাসকে শুধু ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নয়, সমকালীন সঙ্গীত ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত করেছে। ঐতিহাসিক দুর্গের পরিবেশে আধুনিক সঙ্গীত উৎসবের আয়োজন অতীত ও বর্তমানের এক অভিনব সংযোগ তৈরি করে।
আরাসের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইউনেস্কো ঐতিহ্য যুদ্ধের স্মৃতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্তর ফ্রান্সের এই অঞ্চল পশ্চিম ফ্রন্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে আরাস ও এর আশপাশে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
আরাসের বিশেষত্ব এখানেই যে শহরটির ঐতিহ্য একক কোনো যুগ বা স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যযুগীয় বেলফ্রি শহরের নাগরিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কথা বলে, ভোবাঁর সিটাডেল ইউরোপের সামরিক প্রকৌশল ও রাজকীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস তুলে ধরে, আর যুদ্ধসমাধি ও স্মৃতিসৌধগুলো বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতির কথা মনে করিয়ে দেয়। অর্থাৎ একই শহরের মধ্যে কয়েক শতাব্দীর ইউরোপীয় ইতিহাস পাশাপাশি উপস্থিত।
এ কারণেই আরাসকে শুধু একটি পর্যটনশহর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। শহরটির রাস্তা, চত্বর, দুর্গ, গির্জা, সমাধিক্ষেত্র এবং স্মৃতিসৌধ- সবকিছু মিলিয়ে এটি যেন একটি উন্মুক্ত ইতিহাসের বই। এখানে স্থাপত্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে ধ্বংস ও পুনর্গঠনের গল্প, সামরিক শক্তির ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে যুদ্ধের মানবিক মূল্য, আর মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক সংস্কৃতি ও নগরজীবন।



