যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসার আহ্বান সিপিডির

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • গভর্নরের নিয়োগ ‘অস্বচ্ছ ও দুর্বল’ প্রক্রিয়ায় হয়েছে
  • তিন জায়গায় ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব

শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিকে ‘চরম বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে তা থেকে ‘সরে’ আসার আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, চুক্তিটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী মসৃণ রূপান্তর কৌশল (এসটিএস) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই চুক্তি বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সাথে সাংঘর্ষিক।

তিনি আরো বলেছেন, যে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা মোটেই স্বচ্ছ নয়। এই নিয়োগ ছিল অস্বচ্ছ ও দুর্বল প্রক্রিয়া।

গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত : ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য সরকারের ঘোষিত ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। এ কৌশলের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও সমঝোতা চুক্তি (সেপা) শুরু, দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এর সাথে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি আপগ্রেডেশন, উদ্ভাবন, সবুজ পরিবহন এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ৬ ও ৯ ফেব্রুয়ারি দু’টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। একটি যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যবিষয়ক চুক্তি। অন্যটি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির ধারাগুলো বিশ্লেষণ করে সিপিডি একে বৈষম্যমূলক বলে মনে করছে।

সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, চুক্তির বিভিন্ন অনুচ্ছেদে আমদানি লাইসেন্সিং আরোপ না করা, টেকনিক্যাল রেগুলেশন, স্ট্যান্ডার্ড ও কনফরমিটি অ্যাসেসমেন্টে মার্কিন কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা রয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শূন্য শুল্কে যাবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ ও অ্যাড ভ্যালোরেম শুল্কের আওতায় থাকবে, এমনকি প্রয়োজনে বাড়তি শুল্ক আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে।

স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সাথে এমন চুক্তি করতে পারবে না যা মার্কিন মানদণ্ডের সমতুল্য নয়। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সংক্রান্ত অনির্ধারিত ক্ষেত্রে মার্কিন পণ্যের তালিকা অনুযায়ী নির্দেশক ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে বলেও দাবি সিপিডির।

সার্ভিস খাতে মার্কিন সেবাদানকারীদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ের সুযোগ দিতে হবে এবং সীমান্ত ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকে ব্যবস্থা নিতে হবে- এমন শর্তও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে কোনো দেশের পণ্যে ক্ষতির অভিযোগ উঠলে বাংলাদেশকেও সমজাতীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, তবে বাংলাদেশ ভ্যাট বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না, ধরনের বিধানও চুক্তিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি।

ডিজিটাল বাণিজ্য, ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনে কাস্টমস শুল্ক আরোপ, তৃতীয় দেশের সাথে ডিজিটাল ট্রেড চুক্তি-এসব ক্ষেত্রেও মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণœ হলে সীমাবদ্ধতা আরোপের শর্ত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। পাশাপাশি রফতানি নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ চুক্তি, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগে বিশেষ সুযোগ, এমনকি মার্কিন তুলা ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট টেক্সটাইল পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধার মতো শর্তও এতে যুক্ত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিপিডির মতে, এ ধরনের শর্তাধীন চুক্তি কার্যকর হলে রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও এফডিআই আকর্ষণের মতো এসটিএসের মূল লক্ষ্যগুলো বাধাগ্রস্ত হবে এবং এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতি চুক্তি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনাকেও একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।

অস্বচ্ছ ও দুর্বল প্রক্রিয়ায় গভর্নর নিয়োগ

অস্বচ্ছ ও দুর্বল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গভর্নর নিয়োগে সুস্পষ্ট নির্বাচন মানদণ্ড ও আইনগত কাঠামো না থাকায় এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে যে সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা অনেকটাই ব্যক্তি-নির্ভর ছিল। সে সময়ের গভর্নর নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নানা সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও এ ধরনের সংস্কার সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করে না এবং স্বার্থগোষ্ঠীর বাধা তৈরি হয়, তবু তিনি বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও পদক্ষেপ বাস্তবায়নে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

তার মতে, আর্থিক খাতে যে ‘ফিরে আসার প্রক্রিয়া’ শুরু হয়েছিল, তা অব্যাহত রাখতে হলে আগের গভর্নরকে দায়িত্বে রাখা সরকারের জন্য ইতিবাচক হতে পারত। এখনো তিনি মনে করেন, ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সংস্কার প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী হতো।

গভর্নর নিয়োগের বর্তমান কাঠামো প্রসঙ্গে সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, দেশে গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কোনো সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া নেই। কেবল ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতার সাধারণ শর্ত রয়েছে। তিনি জানান, তুলনামূলকভাবে তিনি রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করেছেন। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কমিটি শর্টলিস্ট তৈরি করে; প্রার্থীর কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা, আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা, একাডেমিক যোগ্যতা এবং পেশাগত দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশেও গভর্নরসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও মানদণ্ডভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। একটি স্বতন্ত্র কমিটির মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের শর্টলিস্ট করে, সাক্ষাৎকার নিয়ে সেখান থেকে সরকার চূড়ান্ত নির্বাচন করতে পারে এমন ব্যবস্থা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমান গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার আরো ভালো ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প বেছে নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক খাত এখনো কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে; এ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত ও শক্তিশালী রেগুলেটরি কাঠামো প্রয়োজন। সে বিবেচনায় নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল।

ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে গভর্নর নিয়োগে সুস্পষ্ট নির্বাচন মানদণ্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন, তিনি যেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহমান মনসুর ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেন।

তিন জায়গায় ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়। এজন্য থদুর্নীতি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে। দুর্নীতি রোধে আমরা কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল নিয়োগের কথা বলছি। যত দ্রুত সম্ভব সরকারকে নিয়োগ দেয়া উচিত বলে মনে করছি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে আমরা দেখেছি। এশিয়ার মধ্যে আমাদের রাজস্ব জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এই মুহূর্তে। এখানে বিএনপি সরকার রাজস্বের টার্গেটে ৪ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়, এটা আমাদের বাস্তবসম্মত হয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ যা ১৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় সম্পদ কর যুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। এক্ষেত্রে কর ন্যায্যতা যেন মাথায় রাখেন সেটা আমরা বলতে চাই।

তিনি বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় আমাদের প্রস্তাব থাকবে কর বৈষম্য কমাতে এনবিআরের উচিত হবে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা। যারা নিয়মিত কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, কর ছাড়, কর আহরণ ইত্যাদি বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। অন্য দিকে ভ্যাট রেটের ক্ষেত্রে ৮টি সø্যাব রয়েছে, সেটাকে কমিয়ে ধীরে ধীরে ৩ সø্যাবে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে ভ্যাট হার দু’টি সø্যাব এবং পরবর্তী সময়ে সিঙ্গেল হারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলছি।