নয়া দিগন্ত ডেস্ক
চৌদ্দ বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে নিখোঁজ সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম গতকাল শুক্রবার এ আদেশ দেন বলে সিএমএম আদালতের হাজতখানার ইনচার্জ মো: মোরশেদ আলম জানান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার বাড্ডার বাসা থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমাদেরকে একটা রিকুইজিশন দিয়েছিল। সেই রিকুইজিশনের ভিত্তিতে ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছি, ডিবিতে থাকাকালীন এই কর্মকর্তা ও তার টিম সুখরঞ্জন বালীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে অপহরণের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। সেদিন সুখরঞ্জন বালীকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নেয়ার সময় ফজলুর রহমান তার গালে চড় মেরেছিলেন।
ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা মো: হেলালুল ইসলাম।
আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য সুখরঞ্জন বালী আইনজীবীর সাথে গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালের মূল ফটকের সামনে যান। গাড়ি থামার সাথে সাথে সাদা পোশাকধারী বাহিনীর লোকজন সুখরঞ্জন বালীকে গাড়ি থেকে টেনে-হেঁচড়ে নামিয়ে জোর করে তাদের সাদা ডবলকেবিন গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তারপর ভিকটিম সুখরঞ্জন বালীকে চোখবাঁধা অবস্থায় দুই মাস শারীরিক নির্যাতন করে অন্ধকার বন্দিশালায় আটক রাখে। পরবর্তীতে ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ বছর আটক থাকার পর সেখানকার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে তার ছেলে অপূর্ব বালী জানতে পেরে ভারতে গিয়ে কারাগার থেকে তার বাবাকে জামিনে মুক্ত করে নিয়ে আসেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, মামলার তদন্তকালে এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণে জানা যায়, ঘটনার দিন ডিএমপি ডিবি থেকে দু’টি ডবলকেবিন গাড়িতে আসামি মো: ফজলুর রহমান ও তার সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্স আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুরাতন হাইকোর্ট ভবনের সম্মুখ থেকে জোরপূর্বক ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে হাজতখানায় রাখার পর তাকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার সাথে ফজলুর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে নিখোঁজ হন পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী। পরে তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া যায় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়। তবে তার পরিবার ও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাকে তুলে নেয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী।
যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় এবং পরে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ায় ‘গুম’ ও ‘নির্যাতনের শিকার’ হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নামে সেখানে অভিযোগ করেন সুখরঞ্জন। ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে বিবাদি করা হয় আরো ১০ থেকে ১৫ জনকে। তালিকায় অন্যদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নাম রয়েছে।



