মূলধনী মুনাফায় ১৫% করের ধাক্কা করের জালে ফ্ল্যাট থেকে ক্রিপ্টো

বাজেট ২০২৬-২৭

সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবার অর্থমন্ত্রী এমন এক কৌশল অবলম্বন করেছেন, যেখানে ‘সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি’ মানেই করযোগ্য মুনাফা। ফ্ল্যাট কেনাবেচা, স্বর্ণালঙ্কার, ডিজিটাল মুদ্রা থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার-সবক্ষেত্রেই ১৫% মূলধনী মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের ঘোষণা এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল করের আওতা বাড়ানো নয়, বরং বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশের পর থেকেই দেশের কর ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে চারদিকে চলছে ব্যাপক আলোচনা। সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবার অর্থমন্ত্রী এমন এক কৌশল অবলম্বন করেছেন, যেখানে ‘সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি’ মানেই করযোগ্য মুনাফা। ফ্ল্যাট কেনাবেচা, স্বর্ণালঙ্কার, ডিজিটাল মুদ্রা থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার-সবক্ষেত্রেই ১৫% মূলধনী মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্সের ঘোষণা এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল করের আওতা বাড়ানো নয়, বরং বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফ্ল্যাটের ওপর কর : জল্পনা বনাম বাস্তবতা

বাজেট পেশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন খাত। সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও এনবিআর স্পষ্ট করেছে, এই কর সরাসরি সাধারণ ক্রেতার ওপর নয়; বরং এটি মূলত তাদের ওপর, যারা জমির মালিক হিসেবে ডেভেলপারের সাথে যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে ফ্ল্যাট পান। আগের নিয়মে, জমির মালিকরা ডেভেলপারের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা ‘সাইন-ইন মানি’ গ্রহণ করলে শুধু তার ওপর কর দিতে হতো। ফ্ল্যাটগুলো ছিল সম্পূর্ণ করমুক্ত। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে জমির বিনিময়ে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট বা অন্য যেকোনো অ-নগদ সুবিধাকেও ‘মূলধনী সম্পদ হস্তান্তরের লাভ’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

এনবিআরের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে, ফ্ল্যাটের সরকারি মৌজা মূল্য থেকে জমির আদি ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে যে অবশিষ্ট মুনাফা দাঁড়াবে, তার ওপর ১৫% কর দিতে হবে। উদাহরণের সাহায্যে বললে, ২০ বছর আগে ৫০ লাখ টাকায় কেনা জমি এখন ফ্ল্যাট নির্মাণের পর যদি অনেক বেশি মূল্যের হয়, তবে সেই বর্ধিত মূল্য থেকে আদি ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে মুনাফার ওপর সরকারকে ১৫% কর দিতে হবে।

সম্প্রসারিত করের জাল : বিলাসিতা নাকি বিনিয়োগ?

সরকার শুধু আবাসন খাতেই থেমে থাকেনি। করের পরিধি বাড়িয়ে এনবিআর এবার হাত দিয়েছে বিলাসদ্রব্য ও আধুনিক আর্থিক বিনিয়োগের ওপর। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, নিচের ক্ষেত্রগুলোতেও ১৫% মূলধনী মুনাফা কর প্রযোজ্য হবে :

স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু : স্বর্ণালঙ্কার, হীরা, রূপা বা অন্যান্য মূল্যবান পাথর বিক্রি করে লাভ করলে ১৫% কর দিতে হবে। এনবিআরের ভাষ্যমতে, অবৈধ অর্থকে বৈধ করার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে অনেকেই স্বর্ণ কেনেন, যা রোধ করতেই এই পদক্ষেপ।

ডিজিটাল মুদ্রা : ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল ডিজিটাল সম্পদ এখন বাংলাদেশে কোনো স্বীকৃত মুদ্রা না হলেও, এগুলো বিক্রয়লব্ধ লাভের ওপর ১৫% কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শিল্পকর্ম ও ক্লাব মেম্বারশিপ : শৌখিনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত আর্টওয়ার্ক বা অ্যান্টিকস (প্রাচীন নিদর্শন) বিক্রি এবং প্রিমিয়াম ক্লাব মেম্বারশিপ হস্তান্তরের মুনাফাকেও করের আওতায় আনা হয়েছে।

সিকিউরিটিজ ও বন্ড : ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং শেয়ারবাজার থেকেও অর্জিত মূলধনী মুনাফার ওপর একই হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারের যুক্তি ও রিয়েল এস্টেট খাতের শঙ্কা

সরকার ও এনবিআরের মূল দর্শন হলো-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। তাদের মতে, সম্পদের দাম বেড়ে যদি মুনাফা হয়, তবে সেই মুনাফার ওপর সমজাতীয় কর কাঠামো থাকা উচিত। নগদ আয়ের মতোই অ-নগদ সুবিধা বা সম্পদ বিক্রয়লব্ধ লাভকেও করযোগ্য হিসেবে গণ্য করা সরকারের রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর একটি বড় উপায়।

তবে এই প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনের মতে, জমির মালিকের ওপর এই করের বোঝা পড়লে তা ডেভেলপারদের জন্য সঙ্কট তৈরি করবে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের দাবি, এটি পরোক্ষভাবে ‘দ্বৈত কর’-এর মতো প্রভাব ফেলবে। এতে জমির মালিকের মুনাফা কমবে, যার প্রভাব পড়বে নতুন ফ্ল্যাটের দামে। সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট কেনা ইতোমধ্যে কঠিন হয়ে পড়েছে, নতুন এই কর কাঠামো সেই সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, এনবিআরের এই পদক্ষেপটি একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। এতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের পথ অনেকটাই সঙ্কুুচিত হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে একই সাথে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছুটা নেতিবাচক বার্তা হতে পারে। যদি করের হার অতিরিক্ত মনে হয়, তবে অনেকেই সম্পদ বিক্রির পরিবর্তে আটকে রাখার প্রবণতা দেখাতে পারেন, যা বাজারে তারল্য সঙ্কট বা স্থবিরতা তৈরি করতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পথে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা। ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে ডিজিটাল সম্পদ সরকারের করের এই নতুন জাল কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি।