বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারত ও বিএনপির মধ্যকার দীর্ঘদিনের টানাপড়েনপূর্ণ সম্পর্ক নতুন করে পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পুনর্গঠন আদৌ কতটা টেকসই হবে- এ প্রশ্ন তুলেই আলজাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশে এখন তারেক রহমান ক্রমেই ‘সবচেয়ে নিরাপদ বাজি’ হয়ে উঠছেন।
প্রতিবেদনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, কয়েক দশক ধরে ভারত-কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরবে- বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের বিরোধিতা করে এসেছে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে খালেদা জিয়ার “দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ আমাদের অংশীদারত্বের উন্নয়নে নির্দেশনা দেবে”- এই মন্তব্য নয়াদিল্লি-বিএনপি সম্পর্কে এক নাটকীয় মোড়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সৌজন্য নয়; বরং বিএনপির সাথে ভারতের অতীত সম্পর্কের একটি স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
অবিশ্বাসের ইতিহাস : ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপির লাখো সমর্থকের ভূমিকা সত্ত্বেও, ১৯৯১ সালে দলটি প্রথম ক্ষমতায় এলে ভারত তাদের সন্দেহ ও অবিশ্বাসের চোখে দেখেছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্ক, যে দলটি ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতার পক্ষে বলে বিবেচিত। অন্য দিকে ভারত শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগকেই দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে দেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি-ভারত সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতার ওপর।
জুলাই বিদ্রোহের পর নতুন বাস্তবতা : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর, বাংলাদেশের রাজপথে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির দীর্ঘ সমর্থনই এই জনমনের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যদিও ভারত জামায়াতের রাজনীতিকে এখনো গ্রহণযোগ্য মনে করে না। এই বাস্তবতায়, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য নয়াদিল্লির কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
১৭ বছর নির্বাসন শেষে ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেন, তিনি এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চান যেখানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা আলজাজিরাকে বলেন, নির্বাসনের বছরগুলোতে তারেক রহমান “পরিপক্ব হয়েছেন।”
বদলানো হিসাব-নিকাশ : বিজেপি-শাসিত ভারত ও বিএনপি-শাসিত বাংলাদেশের অতীত সম্পর্কজুড়ে ছিল বাণিজ্য বিরোধ, সীমান্ত সমস্যা, নদীর পানি বণ্টন, অভিবাসন, সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে, বিএনপি আমলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় পেয়েছে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তাদের যোগাযোগ ছিল। ঢাকা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।
শ্রিংলার ভাষায়, “২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশ ভারতবিরোধী নীতির দিকে ঝুঁকেছিল এবং পাকিস্তানের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। তারেক রহমান সেই সরকারের একজন প্রধান চালক ছিলেন এবং তার প্রভাব ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ।” তবুও সময় বদলেছে। শ্রিংলার মতে, তারেক রহমান এখন বুঝতে পেরেছেন, একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে ভারতের সমর্থন না হলেও অন্তত ভারতের বিরোধিতা এড়ানো জরুরি।
সবচেয়ে নিরাপদ বাজি : ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আলজাজিরাকে বলেন, ভারতের দৃষ্টিতে তারেক রহমান এখন “সব সঠিক কথা বলছেন।” লন্ডন থেকে ফেরার সময় ঢাকার রাস্তায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ, যা স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।
এ কারণেই বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তুলনায় তারেক রহমানই নয়াদিল্লির জন্য ‘সবচেয়ে নিরাপদ বাজি’। বাংলাদেশে আট বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বলেন, ভারত ছাত্রবিপ্লবীদের ও জামায়াতে ইসলামীকে তার স্বার্থের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি “অসাধারণ পরিপক্বতা” লক্ষ করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচন-পূর্ব দূরত্ব ভারতের আস্থা বাড়িয়েছে। যদিও অতীতের স্মৃতি নয়াদিল্লির জন্য সহজ নয়। তার ভাষায়, “ভারত আনন্দের সাথে নয়, প্রয়োজনের তাগিদেই তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ করছে।”
শুধু কূটনৈতিক উষ্ণতা যথেষ্ট নয় : তবে আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, কেবল করমর্দন, ছবি আর সৌজন্যমূলক চিঠিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামত হবে না। তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন শুরু করতে হলে “অতীত থেকে স্পষ্ট বিরতি” প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার শাসনে বাংলাদেশ কার্যত ভারতের ‘ পোষা কুকুরে’ পরিণত হয়েছিল। তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে সমান দূরত্ব বজায় রেখে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করবেন।
কবির আরো বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ শেখ হাসিনাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিতে ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। এই সম্পর্ক রক্ষার দায় নয়াদিল্লির, কারণ হাসিনা এখন ভারতেই অবস্থান করছেন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েতের মতে, তারেক রহমান ক্ষমতায় ফিরলে ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পাকিস্তান ও অন্যান্য ভারতবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ। সবশেষে আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ভারত যদি সত্যিই দিক পরিবর্তন করতে চায়, তবে সম্পর্ককে ব্যক্তিনির্ভর না রেখে রাষ্ট্র ও জনগণের স্তরে পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী জনমত ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য নয়াদিল্লির সাথে কাজ করাকে আরো কঠিন করে তুলবে।



