শামসুল ইসলাম
বিপদের দিনে জরুরি ক্রয়ের নামে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ এখন বিল পরিশোধের অপেক্ষায়। বিপিএপিএর রিভিউ প্যানেল টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে; আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেই নির্দেশ মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও ছাড় করেছে ৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। কিন্তু কেন্দ্রীয় মেডিক্যাল স্টোরস ডিপোর (সিএমএসডি) নিজস্ব নথিতেই প্রশ্ন উঠেছে- যে ক্রয়ে বিজ্ঞাপন, নোয়া, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও চুক্তির মতো মূল ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়নি, বিল পরিশোধের সময় কিভাবে সেই একই আর্থিক বিধি ‘অনুসরণ’ করা সম্ভব?
করোনার সেই দিনগুলো এখন ইতিহাস। হাসপাতালের করিডোরে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, চিকিৎসকদের সুরক্ষাসামগ্রীর তীব্র সঙ্কট- পিপিই, মাস্ক, গগলসসহ জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা তখন রাতারাতি বহুগুণ বেড়ে যায়। রাষ্ট্রের সামনে তখন একটিই অগ্রাধিকার: যেকোনো মূল্যে চিকিৎসাসামগ্রী সংস্থান করা।
সেই জরুরি পরিস্থিতিতেই সিএমএসডির দরজা দিয়ে ঢুকেছিল একের পর এক সরবরাহ আদেশ। দীর্ঘ দরপত্রপ্রক্রিয়ার সুযোগ ছিল না। সরকারি নথির ভাষায়, জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মালামাল সরবরাহের আদেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু মৌলিক ধাপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিজ্ঞাপন দেয়া হয়নি, নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড ইস্যু করা হয়নি, নেয়া হয়নি পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, এমনকি কোথাও চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়াও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি- এমন তথ্য সিএমএসডির নিজস্ব নথিতেই উঠে এসেছে।
তারপর কেটে গেছে প্রায় ছয় বছর। কিন্তু জরুরি ক্রয়ের সেই হিসাব আজও পুরোপুরি মেলেনি। ২০২৬ সালে এসে সেই হিসাবের একটি অধ্যায় এসে ঠেকেছে ৮৩ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার ১৮৪ টাকায়। আর এই অর্থের সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব: টাকা পরিশোধ করা হবে, নাকি টাকা দিতে গিয়ে নতুন করে বিধি ভঙ্গের দায় তৈরি হবে?
যে চিঠি পুরো ঘটনা নতুন করে সামনে আনল
২০২৬ সালের ২ মার্চ। সিএমএসডির পরিচালক মোহা: নায়েব আলী স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে একটি চিঠি পাঠান। বিষয়- বিপিএপিএর রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২টি আদেশের বিল পরিশোধ।
চিঠিটি নিছক অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক পত্র নয়; বরং এর প্রতিটি বাক্য করোনাকালীন সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনার গভীর দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে। পরিচালক জানান, বিপিএপিএর রিভিউ প্যানেল যেসব প্রক্রিয়াগত বিচ্যুতি বিবেচনা করে বিল পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ছিল বিজ্ঞাপন প্রচার, নোয়া ইস্যু, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি গ্রহণ ও চুক্তি সম্পাদনের মতো বিষয়।
অর্থাৎ, রাষ্ট্র জানে কোথায় কোথায় নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছিল। রাষ্ট্র এটাও জানে যে সরবরাহকারীদের টাকা দেয়ার জন্য একটি রিভিউ প্যানেল সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অর্থ ছাড়ের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে- পিপিএ-২০০৬, পিপিআর-২০০৮ এবং সংশ্লিষ্ট সব আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। এই দুই প্রশাসনিক বাস্তবতার মাঝখানেই আটকে আছে ৮৩ কোটি টাকার ফাইল।
জরুরি ক্রয়ের সূচনা যেভাবে
২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ যখন মারাত্মক রূপ নেয়, তখন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে একটি রিট পিটিশন (নং ৩৮১৭/২০২০) করা হয়। সিএমএসডির বর্তমান নথি অনুযায়ী, সেই রিট এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২৪ মার্চ ২০২০-এর নির্দেশনার আলোকে তৎকালীন পরিচালক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরুরি ভিত্তিতে মালামাল সরবরাহের আদেশ দেন। ফলে নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ বাদ পড়ে।
এখানে দু’টি বিষয় আলাদা করা জরুরি: জরুরি ভিত্তিতে ক্রয় প্রয়োজনীয় ছিল কি না- সেটি এক প্রশ্ন। আর জরুরি ক্রয় করতে গিয়ে আইন ও বিধির কোন কোন ধাপ বাদ দেয়া হয়েছিল এবং সেই ব্যত্যয়ের অনুমোদন কোথা থেকে এসেছিল- সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। অনুসন্ধানের মূল জায়গাটি দ্বিতীয়টি নিয়েই।
৫৭ প্যাকেজ ও ৩৪৩ কোটি টাকার বকেয়া
করোনাকালে সিএমএসডির নেয়া বিভিন্ন জরুরি ক্রয়ের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে বকেয়া বিলে পরিণত হয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবাজেটে বিভিন্ন সুরক্ষাসামগ্রী ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের ৫৭টি প্যাকেজের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য অর্থ বিভাগ ৩৪৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছিল। তবে টাকা বরাদ্দ হলেও প্রশ্নের সমাধান হয়নি। সিএমএসডি নিজেই ক্রয়প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলোর কথা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে জানায়। সরকারি অর্থের বরাদ্দ থাকলেও ক্রয়প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন খোদ সরকারি নথিতেই থেকে যায়। ২০২২ সালে বকেয়া বিলের বিষয়ে তৎকালীন সিপিটিইউর মতামত নেয়া হয়। পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৩৮(১) ও ৩৮(২)-এর আলোকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে বলে সিপিটিইউ মতামত দেয়।
তবে অর্থ বিভাগের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা জানায়, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী এই বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়ে অর্থ বিভাগের নিজস্ব মতামত দেয়ার সুযোগ নেই। এখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা। এক দফতর বলছে চুক্তির শর্ত দেখে অর্থ পরিশোধ করা যায়, অন্য দফতর বলছে তাদের মতামত দেয়ার এখতিয়ার নেই। এরপর সরবরাহকারীরা বিপিএপিএর রিভিউ প্যানেলের দ্বারস্থ হন।
সরবরাহকারীরা প্রথমে সিএমএসডি, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে আবেদন করে সাড়া না পেয়ে বিপিএপিএর রিভিউ প্যানেলে আবেদন করেন। শুনানিতে সিএমএসডির পক্ষ থেকে নথি উপস্থাপন করা হয় এবং সেখানেই উঠে আসে যে বিজ্ঞাপন, নোয়া, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও চুক্তির মতো বাধ্যবাধকতাগুলো সম্পন্ন হয়নি।
সিএমএসডির পক্ষ থেকেই ব্যত্যয়গুলো রিভিউ প্যানেলের সামনে তুলে ধরা সত্ত্বেও প্যানেল ১২টি আদেশের বিল পরিশোধের নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ, ক্রয়প্রক্রিয়ার বিচ্যুতিগুলো বিবেচনায় নিয়েই প্যানেল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছিল- যা অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলগত ভিত্তি।
‘টাকা দিতেই হবে’- আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত
২০২৫ সালে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। বিপিএপিএ রিভিউ প্যানেলের আদেশ মানা বাধ্যতামূলক কি না- এ প্রশ্নে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়।
২০২৫ সালের ১৯ জুনের মতামতে আইন মন্ত্রণালয় জানায়, হাইকোর্টের আদেশের আলোকে জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়কার্যক্রম চালানো হয়েছিল এবং রিটটি নিষ্পত্তি হয়েছে। সেই সাথে পিপিএ ও বিধিমালা অনুযায়ী রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সরবরাহকারীদের মূল্য পরিশোধের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরবর্তীতে বিপিএপিএ-ও জানায়, পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৬০(৫) অনুযায়ী রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
তাহলে কি জটিলতার নিরসন হলো? না। কারণ বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াটি কিভাবে আইনি ও বিধিসম্মত হবে- সেই প্রশ্ন থেকেই গেল।
৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকার বরাদ্দ ও দায়ের স্থানান্তর : ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি অর্থ বিভাগ বিপিএপিএর ১২টি আদেশের বিপরীতে ৮৩ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার ১৮৪ টাকা ছাড়ের সম্মতি দেয়। এই অর্থ সিএমএসডির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চিকিৎসাসামগ্রী খাত থেকে বরাদ্দ করা হয়। তবে অর্থ বিভাগ টাকা ছাড়ের সময় শর্ত জুড়ে দেয়- পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ সহ সব আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ী থাকবেন অর্থ ব্যয়কারী কর্মকর্তা। অর্থাৎ, টাকা মঞ্জুর করা হলেও চূড়ান্ত দায় ঠেলে দেয়া হলো মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার ওপর।
কারা পাচ্ছেন এই অর্থ? : অর্থ বিভাগের নথিতে ১২টি বিপিএপিএ আদেশের বিপরীতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় অঙ্কের দাবিদারদের মধ্যে রয়েছে: মেসার্স আল-মদিনা ট্রেডার্স: ৩৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা; সি লোটাস শিপিং এজেন্সি: ৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা; ইনসেনটিভ মেডিক্যাল সার্ভিসেস: সাত কোটি ৪০ লাখ টাকা; কে এইচ ইন্টারন্যাশনাল: পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ ১৮ হাজার ১৮৪ টাকা; তবে প্রতিটি চালানের বিপরীতে বাস্তবে কত ইউনিট পণ্য সরবরাহ করা হয়েছিল, কোনো গুদামে তা জমা পড়েছিল এবং গ্রহণ কমিটির প্রত্যয়ন ছিল কি না- সেসব নথির চুলচেরা বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে এই পাওনার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিরূপণ সম্ভব নয়। অনুসন্ধানে সরকারি নথির বিভিন্ন অংশে কিছু অঙ্ক ও আদেশ নম্বরের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। যেমন, এক স্থানে ‘০৯৩/২০২৪’ আদেশের উল্লেখ থাকলেও অন্য স্থানে একই ক্রম ‘০১৩/২০২৪’ হিসেবে দেখা যায়। এগুলো কেবল টাইপিং বা ওসিআর ত্রুটি নাকি নথির গরমিল- তা নিশ্চিত হতে মূল বিপিএপিএ আদেশ, বিল ও সরবরাহ রেজিস্টার পুনর্মিলন করা আবশ্যক।
সিএমএসডি পরিচালকের আশঙ্কা : ২০২৬ সালের ২ মার্চের চিঠিতে সিএমএসডি পরিচালক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিপিএপিএ যেসব বিচ্যুতি বিবেচনা করে বিল পরিশোধের আদেশ দিয়েছিল, অর্থ মঞ্জুরিপত্রে সেগুলো কিভাবে সমন্বিত হবে তা অস্পষ্ট। সাধারণ শর্তে এই বিল পরিশোধ করা হলে সিএমএসডি ভবিষ্যতে বড় ধরনের অডিট আপত্তি ও আর্থিক দুর্নীতির খড়গের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কার কথা জানান। ২০২৫ সালের ১৭ জুনের একটি সভায় স্বাস্থ্য অডিট অধিদফতরের প্রতিনিধি জানান, নীতিগত পর্যায় থেকে লিখিত নির্দেশনা থাকলে অডিটের সময় করোনাকালীন পরিস্থিতির বিবেচনায় এই অর্থ পরিশোধ গ্রাহ্য হতে পারে। ফলে অধস্তন কর্মকর্তারা এখন নীতিগত পর্যায়ের পরিষ্কার ও লিখিত নির্দেশনা দাবি করছেন। বিপিএপিএর তথ্য অনুযায়ী, সিএমএসডি-তে ৬৩ শতাংশ পদ শূন্য থাকা এবং নিজস্ব ক্রয় সেল না থাকার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। যদিও বর্তমানে সংস্থাটি ওপেন টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বজায় রেখে কেনাকাটা করছে, তবে ২০২০ সালের জরুরি কেনাকাটার বকেয়া আজও তাদের প্রশাসনিক জটিলতার কারণ হয়ে রয়েছে।
শেষ কথা : অর্থ ও দায়ের চূড়ান্ত পরিণতি : পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আদালতের আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে পাওনা পরিশোধ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রক্রিয়ার আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ৮৩ কোটি টাকা ছাড়ের পর ফাইল হয়তো বন্ধ হবে, কিন্তু অডিট ও হিসাব পর্যালোচনার অধ্যায় এখনো বাকি। করোনা মহামারীর জরুরি পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় যে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান লিখিত ও স্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে না হলে এই ফাইলটি ভবিষ্যতেও একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক সঙ্কটের দলিল হয়েই থাকবে।



