জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল

চাপ পড়বে সর্বত্র, বাড়বে মূল্যস্ফীতি ও জনদুর্ভোগ

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল

  • ডিজেল বেড়েছে ১৫ টাকা
  • অকটেন ২০ টাকা
  • পেট্রল ১৯ টাকা
  • কেরোসিন ১৮ টাকা

বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকার দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। গত রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন এই মূল্য আজ থেকে কার্যকর হচ্ছে।

নতুন মূল্য অনুযায়ী ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রলে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ভোক্তা পর্যায়ে অকটেনের দাম ছিল ১২০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা এবং ডিজেল ১০০ টাকা প্রতি লিটার। অর্থাৎ এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বৃদ্ধি শতাংশের হিসেবে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে, যা একসাথে কার্যকর হওয়ায় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বিবেচনা করে এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি খাতে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে টেকসই রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ : সরকার বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, সরবরাহ সঙ্কট এবং বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিনির্ভর দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপ সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ দিন ধরে ভর্তুকির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা টেকসই থাকেনি। ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে মূল্য সমন্বয়ের পথে যেতে হয়েছে।

পরিবহন খাতে তাৎক্ষণিক প্রভাব : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, সিএনজি চালিত যানবাহনসহ সব ধরনের পরিবহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির দাবি উঠতে পারে।

পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। চাল, ডাল, সবজি, মাছ-গোশত সবকিছুর দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

মোবাইল ও প্রযুক্তি পণ্যের দামেও প্রভাব : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কেবল পরিবহন বা কৃষি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে প্রযুক্তি পণ্যেও। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী আমদানি ও বাজারজাতকরণে পরিবহন ব্যয় একটি বড় উপাদান। জ্বালানির দাম বাড়লে এই খরচও বাড়ে, ফলে মোবাইল ফোনসহ প্রযুক্তিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কারখানার উৎপাদন খরচও বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়। ফলে প্রযুক্তি পণ্যের বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে।

কৃষি ও শিল্পে বাড়তি চাপ : ডিজেলচালিত সেচ পাম্প, ট্রাক্টর এবং ফসল পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প খাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়বেন, কারণ তাদের লাভের পরিমাণ তুলনামূলক কম।

মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে। পরিবহন, উৎপাদন এবং সরবরাহ- সব খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে তা পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

বর্তমানে দেশ এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠবে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে- এমন আশঙ্কা ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে। যাতায়াত খরচ বাড়বে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, বিদ্যুতের বিল বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে, সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধি অনেক বেশি হবে- যা সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়াতে পারে।

সরকারের চ্যালেঞ্জ : সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, দুই দিক সামলাতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান : এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে সংস্কার প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানি অপচয় কমানো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ যদি ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানির দিকে এগোয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে এমন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও কিছুটা কমবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গভীর। পরিবহন থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনসহ প্রযুক্তিপণ্য- সবখানেই এর প্রভাব পড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে- এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।