যানজটে অতিষ্ঠ রাজধানীর জনজীবন

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

  • হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিকব্যবস্থা
  • প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা
  • যানজট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা : ড. হাদিউজ্জামান, বুয়েট

রাজধানীর যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। স্কুল-কলেজ, অফিস কিংবা জরুরি সেবার ক্ষেত্রেও দ্রুত গন্তব্যে যাওয়া এখন দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অল্প দূরত্বের পথের জন্যও যানজটের কারণে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতে করে যেমন নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, তেমনি প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তা ছাড়া আধুনিক পদ্ধতি না থাকায় হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিকব্যবস্থা। রাজধানীর কিছু এলাকায় আধুনিক ট্রাফিক লাইটিং পদ্ধতি বসানো হলেও অধিকাংশ পয়েন্টে নেই সেই ব্যবস্থা। এতে করে দিন দিন বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে সড়ক।

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর পল্টন মোড়ে প্রায় ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে যানবাহনকে একই স্থান বসে থাকতে দেখা যায়। তখন যাত্রীদের চেহারায় ছিল বিরক্তির ছাপ। সাইন্সল্যাব মোড়েও দেখা যায় একই চিত্র। অন্য দিকে শাহবাগে যানজট কিছুটা কম থাকলেও মৎস্য ভবন মোড়ে একই স্থানে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫ মিনিটেরও বেশি। গুলিস্তান এলাকায় দেখা যায় গাড়ির তীব্র যানজট। নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি ৩২, বাংলামটর এলাকার সড়কে গাড়ির জটলা লেগেই থাকে। শুধু এসব এলাকায় নয়, গতকাল রাজধানীর প্রতিটি ট্রাফিক পয়েন্টে ছিল যানজট।

মো: আলী দোহা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। রাজধানীর শাহবাগ থেকে বাসে ওঠেন যাত্রাবাড়ী যাওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য বাসায় গিয়ে পরিবারের সাথে প্রথম রোজার ইফতার করবেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি পল্টন মোড়ে ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় বসে আছি। রাজধানীর মতো একটি শহরের চিত্র যদি এমন হয়, তাহলে জনজীবন চলবে কিভাবে? শাহবাগ থেকে পল্টন পর্যন্ত আসতে সময় নিয়েছে ৪৫ মিনিট। অথচ স্বাভাবিকভাবে আসতে সময়ে লাগে মাত্র ৫ মিনিট। ঢাকার ট্রাফিক পুলিশ ও সরকারের উচিত মূল সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে উঠিয়ে দেয়া।

মুয়াজ নামে আরেকজন বলেন, রাজধানীর যানজট আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। কোনো জায়গায় যেতে ২০ মিনিটের পথ দুই ঘণ্টা লাগে। এতে করে সঠিক সময়ে কোনো কাজ করা যায় না। এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখছি না। বিভিন্ন সময় নানা পরিকল্পনার কথা বললেও তার কোনো বাস্তবায়ন নাই।

মিরপুরগামী দিশারি পরিবহনের বাসচালক হাফিজুর রহমান বলেন, আমি গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে প্রায় ৩০ মিনিটের মতো আটকে আছি। সব সড়কেই এ অবস্থা। রোজার মাস হওয়ার পরেও যানজট কমছে না বরং বাড়ছে। এই ঘটনা আজকে নতুন না, প্রতিদিনই প্রতিটি সিগনালে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ট্রাফিক পুলিশ যদি সঠিকভাবে কাজ করত তাহলে এই পরিস্থিতি থাকত না।

এই বিষয়ে কথা হলে ট্রান্সসিলভা পরিবহনের হেলপার শরিফুর বলেন, বাসায় বলে এসেছি সবার সাথে গিয়ে ইফতার করব। কিন্তু যেতে পারব বলে মনে হয় না। কারণ সড়কে যে পরিমাণ ট্রাফিক জ্যাম তাতে গাড়ি সামনের দিকে চলছেই না। সরকার যদি চাইত তাহলে কবেই যানজট বন্ধ করে দিতে পারত। রাস্তায় কেউ নিয়ম মেনে চলতে চায় না- বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এগুলোর কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি তৈরি হয়। রিকশা বাসের সাথে পাল্লা দিয়ে আগে চলে যায়। সরকার যদি সব কিছু ঠিকঠাক করতে পারে তাহলে আমরা আইন মেনে রাস্তায় গাড়ি চালাতে বাধ্য।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের তথ্য মতে, ২০০৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিমি:। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে চার দশমিক আট কিলোমিটারে। ঢাকায় যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে দৈনিক প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক।

অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, যানজটের কারণে রাজধানীতে পরিবহন প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা; এই ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনকে যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এরই মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের নতুন পরিবহন।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য মতে, ঢাকার প্রধান যানজটের হটস্পটগুলোর মধ্যে ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মহাখালী, কুড়িল বিশ্বরোড, বাড্ডা, রামপুরা, পল্টন, গুলিস্তান, সদরঘাট, শাহবাগ, বাংলামোটর, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নিউ মার্কেট, সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর-১০, কাওরান বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, মৎস্য ভবন মোড় ও বিমানবন্দর এলাকা বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য।

রাজধানীতে অতিরিক্ত প্রাইভেট কারের উপস্থিতি যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। ঢাকায় যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাইভেট কার। কোনো কোনো পরিবারের তিন থেকে চারটি প্রাইভেটকার রয়েছে। একটি রিপোর্টে দেখা যায়, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪ দশমিক দুই শতাংশ জায়গা দখলে রাখে প্রাইভেট কার। ট্রাফিক বিভাগের হিসাব মতে, সড়কের কম করে হলেও ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এ ছাড়া ফুটপাথ হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই হেঁটে চলেন নগরবাসী। স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট এসটিপির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কমবেশি ১৫ শতাংশ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন। এ প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ শতাংশেরও বেশি রাস্তা। বাকি ৮৫ শতাংশ যাত্রী বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তারা গণপরিবহনের মাধ্যমে সড়কের মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকা ব্যবহারের সুযোগ পান। ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যালের তোয়াক্কা না করে একই পয়েন্টে আধাঘণ্টা পর্যন্ত একদিকের যানবাহন আটকে রাখে। সবুজ বাতির বদলে ট্রাফিক পুলিশের হাত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে।

ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিস্টেম অকার্যকর হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে হাত-লাঠিনির্ভর সিগনাল সিস্টেম, সিগনালে যানবাহনের পারাপারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, যানজট সৃষ্টি হতে পারে এমন স্থানে গাড়ি পার্কিং করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, আইনের প্রতি সম্মান ও বাধ্য না থাকা, চালকের নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক না করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বনির্বাচনযোগ্য সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা বছর ২৪ ঘণ্টা সিগন্যাল অপারেশন চলমান রাখা, গাড়ির গড় গতি ২৫ থেকে ৩০ কিমি:তে ফিরিয়ে আনা, আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, পথচারীদের যাতায়াতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, আন্তঃবিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন, দূষণকারী বাহন চিহ্নিত করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হওয়ার জন্য শুধু পুলিশই দায়ী, আসলে তা সঠিক নয়। নগরবাসীকে তীব্র যানজট থেকে মুক্তি দেয়ার পাশাপাশি যানজটে হারানো কর্মঘণ্টা বাঁচাতে অটোমেটিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ব্যবস্থায় সিগন্যাল অমান্য করলেই গুনতে হবে জরিমানা। তা ছাড়া অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সব প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে সম্পন্ন হলে চালক থেকে শুরু করে মালিক-যাত্রী সবার স্বার্থ রক্ষা করেই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বাস্তবায়ন করা হবে।

ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেম গবেষক ও ট্রাফিকের সিইও আশরাফুল আলম রতন বলেন, অপরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ঢাকা শহর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম যানজটপ্রবণ নগরে। এখনই যানজট হ্রাসে উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আমাদের প্রত্যাশা গণপরিবহন তথা বাস, রেল ও নৌপথে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে একটি বহুমাধ্যমভিত্তিক সমন্বিত ও জনবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ও পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো: হাদিউজ্জামান বলেন, রাজধানীর যানজট থেকে উত্তরণের পথ অবশ্যই আছে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। ঢাকা শহর দেশের আয়তনের মাত্র দশমিক দুই শতাংশ, তবে জনসংখ্যা বাস করছে ১৫ শতাংশের বেশি। অধিক পরিমাণ জনসংখ্যা রেখে যত ধরনেরই পরিকল্পনা করা হোক না কেন কাজে আসবে না। আমরা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভার বানালেও কাজে আসবে না। তা ছাড়া জনসংখ্যাকে ঢাকামুখী না করে বিমুখী করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে বড় বড় অবকাঠামো ঢাকার মধ্যে না করে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে করতে পারলে ঢাকার জনসংখ্যা কমানো সম্ভব। জনসংখ্যার চাপ কমাতে পারলে যানজটের ভোগান্তিও কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, অধিক পরিমাণ মানুষের কারণে যানবাহনের চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। আমরা এই শহরের উপর অনেক অত্যাচার করেছি, যার প্রায়শ্চিত্ত এখন করতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও ব্যাটারিচালিত রিকশা হলো রাজধানীতে যানজটের অন্যতম কারণ। তা ছাড়া বিভিন্ন খুচরা যানবাহনও এর জন্য দায়ী। নীতিগত দুর্বলতা থাকার কারণে আমাদের এই অবস্থা। কারণ যথাযথ সিদ্ধান্ত সরকার কখনো নিতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে নিতে পারলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ছোট ছোট যানবাহন এত পরিমাণে বেড়েছে যে, সড়কে গণপরিবহন চলতেই পারে না। যেহেতু শহরে গণচাপ বেশি তাই গণপরিবহনকে ঢেলে সাজানো দরকার।

ট্রাফিক পুলিশের কথা জানিয়ে ড. মো: হাদিউজ্জামান বলেন, পুলিশের কাজ হাতের ইশারায় গাড়ি থামানো নয়। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম একটি ব্যাকরণ থাকা দরকার। ছোট ছোট যানবাহনগুলোকে সড়কে নামানোর আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল। এখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে গেছে, তাই ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।