নিজস্ব প্রতিবেদক
- ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ
- খালাসের আর্জি আসামিপক্ষের
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত হেভিওয়েট আসামির বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। শুনানি ও উভয়পক্ষের যুক্তি খণ্ডন শেষে মামলাটি যেকোনো দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সোমবার বিচারক প্যানেলের প্রধান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই সিদ্ধান্ত দেন। এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রথম কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া রায়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল।
মামলার অপর ছয় পলাতক আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
গতকাল রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক খণ্ডন ও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম আসামিপক্ষের ‘আত্মরক্ষা’ ও ‘আনুপাতিক বলপ্রয়োগ’ (প্রোপোর্শনেট ফোর্স)-এর যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে আনুপাতিক বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তুআমরা আদালতকে দেখিয়েছি, নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল কেবল ইট-লাঠি, আর তাদের বিপরীতে লেথাল ওয়েপন (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করে সোজা গুলি চালিয়ে মগজ উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এটি কোনোভাবেই আনুপাতিক বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে আত্মরক্ষা হতে পারে না।’
আইনি ভিত্তির সপক্ষে বসনিয়ার মানবতাবিরোধী অপরাধের নজির টেনে প্রসিকিউটর তামীম ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ (যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ)-এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২) ধারার ‘এ’, ‘জি’ ও ‘এইচ’ উপধারায় স্পষ্ট বলা আছে সরাসরি হত্যা করা যেমন অপরাধ, তেমনি ঊর্ধ্বতন পদে থেকে হত্যার আদেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা উসকানি দেয়া এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়া সমান অপরাধ। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আদেশ কিভাবে মাঠে বাস্তবায়ন হয়েছে তা দেখতে হবে। ওবায়দুল কাদেরের ‘দেখামাত্র গুলি’ (শুট অ্যাট সাইট) ও ‘ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ এ রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক নির্দেশের কারণেই দেশজুড়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়। তাই মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে আসামিরা প্রত্যেকেই সমপরিমাণ অপরাধী।
এর আগে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম অডিও-ভিডিওর ডিজিটাল প্রমাণ পেশ করে কাদেরের সরাসরি নির্দেশনা ও আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের চিত্র তুলে ধরেন। ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম যুক্তিতর্ক শেষ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ দাবি করে প্রত্যেকের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রার্থনা করেছিলেন।
অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনি প্রতিনিধি এম হাসান ইমাম আসামিদের সম্পূর্ণ খালাস দাবি করেন। তার যুক্তিতে তিনি বলেন, সাক্ষীদের কেউই এসব নেতার বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি বা হত্যার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। তিনি ট্রাইব্যুনালে প্রশ্ন তোলেন, ওবায়দুল কাদের কোনো যুদ্ধের কমান্ডার ছিলেন না, তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আন্দোলন দমনে যেসব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ এসেছে, তা এসেছে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে। সুতরাং তাদের ওপর ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ চাপিয়ে দায়ী করা যুক্তিযুক্ত নয়।
যুবলীগ ও ছাত্রলীগের চার আসামির আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন, তার মক্কেলরা আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলার কোনো নির্দেশ দেননি বা কাউকে প্ররোচিত করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতায় তাদের নাম সরাসরি আসেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অধস্তন নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়াকে সরাসরি হত্যায় সহায়তা বলা যায় না। তিনি মামলায় কোনো নারী সাক্ষী না থাকা এবং আসামিদের হাতে লাঠিসোঁটা থাকার ভিডিও প্রমাণ না মিলার অজুহাতে আসামিদের খালাসের জোর আবেদন জানান।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর এই মামলার অভিযোগ আমলে নিয়ে পরোয়ানা জারি করা হয় এবং চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে আদালত। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাকের সাক্ষ্যদানের মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২ আগস্ট অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ ও তদন্ত কর্মকর্তার পুনঃজেরা পর্ব শেষ হলে গতকাল উভয়পক্ষের চড়ান্ত যুক্তিতর্ক নিষ্পত্তির মাধ্যমে মামলাটি রায়ের জন্য প্রস্তুত হয়।



