সেই ১৩ বছর আগে সাভারের রানা প্লাজা ধসের সময় সপ্তমতলায় আটকে ছিলেন মাসুদা আক্তার। তার মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় ভেঙে এখনো শরীরের ভেতরেই রয়ে গেছে। প্রচণ্ড ব্যথা মাসুদার জীবন থেকে এখনো পিছু ছাড়েনি। সপ্তাহে তিন দিন থেরাপি দিতে হয়। দিনে ৮/৯টি ট্যাবলেট খেতে হয়। স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়েছে অনেক আগেই। তার সম্বল ১৭ বছরের একমাত্র ছেলে। ছেলেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে একটি কারখানায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না মাসুদার। নিজেতো এখনো কাজ করতে পারেন না। ছেলে মাসে ছয় হাজার টাকা আয় করে। তা থেকে ঘর ভাড়া দেন আড়াই হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে কোনো রকমে লবণ ভাত খেয়ে দিন রাত পার করেন। এখনো নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। ডাক্তাররা মাসুদাকে বলেন, আপনার শরীরে রক্ত কম। সবজি খাবেন। খাবেন বললেই তো আর খাওয়া যায় না। সবজির যে দাম। উপুর হয়ে সিজদা দিয়ে নামাজ পড়তে পারেন না। ৫ কেজি ওজন তুলতে পারেন না। কিভাবে কাজ করবেন, কারখানা তো দূরের কথা, ঘরেই যেন চিররোগী হয়ে এখন কাটে তার দিন রাত।
মাসুদা পিঠে আঘাত পাওয়ার কারণে এখনো শক্ত হয়ে থাকে। অনেকটা অবশ। তাই প্রতি সপ্তাহে ম্যাসেজ নিতে হয়। কিন্তু যে হাসপাতালে তিনি এ চিকিৎসাসেবা নিতেন সেখান থেকে সেই নার্স চলে গেছেন অন্যত্র। তার স্থানে এসেছেন পুরুষ কর্মী। তাই মাসুদা আর ম্যাসেজ নিতে পারেন না। ফলে পিঠে তীব্র যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয় অহরহ। মাসুদার মতো এখনো অনেক আহত নারী-পুরুষ রানা প্লাজা ধসের পর কাজের জন্য অক্ষম হয়ে দিন পার করছেন।
মাসুদা বলেন, এপ্রিল এলেই আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডাক পড়ে। সবাই শুনতে চান রানা প্লাজা ধসের কথা। আমাদের চোখে পানিতে ভাসে সেই গল্প। রানা প্লাজায় যে পাঁচটি গার্মেন্ট কারখানা ছিল ভবন ধসে সেগুলোতে আহত হাজার পাঁচেক মানুষের কাহিনী কমবেশি মাসুদার মতোই। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আড়াই হাজার। তারা এখন স্থায়ী পুনর্বাসন চান। তাদের অধিকাংশই নারী। যেমন হাসিনা এখনো হাত মুষ্টিবদ্ধ করতে পারেন না। মেয়ে জামাইয়ের কাছে থাকেন। কোনো কাজ করতে পারেন না। হাসিনার স্বামী শ্রমিক, দুই দিন কাজ করলে বয়সের ভারে তিন দিন করতে পারেন না।
অ্যাকশন এইডের জরিপ অনুযায়ী এখনো রানা প্লাজা ধসের পর সাড়ে ৫৪ শতাংশ শ্রমিক বেকার বা দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। তাদের ৩৬ শতাংশ আগের কাজে ফিরে যেতে পেরেছেন। ২৩ শতাংশ শ্রমিকের শারীরিক অবনতি ঘটছে।
এমনকি রানা প্লাজা ধসে নিহতদের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক আছে। সরকারি হিসেবে তালিকাভুক্ত নিহতের সংখ্যা এক হাজার ১৩৬ জন। বাকি ৩৯ জন নিহতের পরিচয় প্রমাণসহ জমা দেয়া হলেও আজো সরকারি তালিকায় তা ওঠেনি। সরকার, সেনাবাহিনী ও বিজিএমইএর তালিকায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে হেরফের রয়েছে। জুরাইন কবরস্থানে নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করে নাম ফলকে রাখার দাবি উঠেছে।
রানা প্লাজা ধসের পর অনেকগুলো মামলা হয়েছে। ১১টি মামলা হয়েছে শ্রম আদালতে, তিনটি ফৌজদারি আদালতে। পাঁচটি হয়েছে উচ্চ আদালতে। একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। যেভাবে মামলাগুলো চলছে, তাতে আরো ১০ বছর লাগবে রায় পেতে এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। মামলাগুলোতে সাক্ষীর সংখ্যা মোট ৫৯৪ জন। ৫০ জনের সাক্ষ্য নেয়া শেষ। তবে যে গতিতে মামলা চলছে আরো ৯ বছর লাগবে বাকিদের সাক্ষ্য শেষ করতে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, সবার সাক্ষ্য নেয়ার প্রয়োজন নেই। এ বছরের মধ্যে আরো অন্তত ৩০ জনের সাক্ষ্য নিলেই মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ আদালতে হাজির করতে পারবেন তারা। এমনকি ওকালতনামায় ক্ষমতা দিলে বিনা পারিশ্রমিকে অনেক আইনজীবী মামলা পরিচালনার জন্যে বছরখানেক ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। একজন নারী শ্রমিকের মেটারনিটি মামলার নিষ্পত্তি হতে তার শিশুর বয়স পাঁচ বছর ছাড়িয়ে গেছে।
তার পরও মাসুদার মতো অসংখ্য শ্রমিকের দাবি তাদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তহবিলে যে ১২৮ কোটি টাকা রয়েছে, তার সুষম বণ্টন হোক। উচ্চ আদালতের আদেশে রানা প্লাজা ভবনের জায়গাটি বাজেয়াপ্ত হয়ে আছে। সেখানে ভবন নির্মাণ করে যে আয় হতে পারে তা আহতদের পুনর্বাসনের কাজে ব্যয় করার দাবিও করেন তারা।



