ইসরাইলের সব সাঁজোয়া ব্রিগেড গাজায় মোতায়েন

আইডিএফের সব সাঁজোয়া ব্রিগেড এখন গাজায় অবস্থান করছে। যার মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যানসহ অন্যান্য ভারী সামরিক যান।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
গাজা অভিমুখে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক (২০ মে তোলা ছবি)
গাজা অভিমুখে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক (২০ মে তোলা ছবি) |সংগৃহীত

  • নাহারে ৪ বছরের শিশুর মৃত্যু
  • চরম অপুষ্টিতে গাজার ৭১ হাজার শিশু ও ১৭ হাজার মা
  • ইসরাইলের হামলায় চিকিৎসকের ১০ সন্তানের ৯ জন নিহত

ইসরাইলি বাহিনীর (আইডিএফ) মোট নিয়মিত সদস্যের সবাইকেই গাজায় মোতায়েন করেছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। গতকাল রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসরাইলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল। গাজা উপত্যকায় স্থল হামলা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

টাইমস অব ইসরাইলের খবর অনুযায়ী, আইডিএফের সব সাঁজোয়া ব্রিগেড এখন গাজায় অবস্থান করছে। যার মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যানসহ অন্যান্য ভারী সামরিক যান। গাজায় মোতায়েনকৃত বাহিনীর মধ্যে রয়েছে গোলানি, প্যারাট্রুপার, গিভাতি, কমান্ডো, কফির, নাহাল,৭ম, ১৮৮তম ও ৪০১তম ব্রিগেড। সাথে রয়েছে রিজার্ভ ইউনিটগুলোও।

এর আগে ইসরাইলি বাহিনী জানায়, গাজায় তারা পঁাঁচটি সামরিক ডিভিশন চালাচ্ছে, যার অর্থ হলো ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটিতে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কড়া হুঁশিয়ারি- হামাস যদি বন্দিবিনিময়ের চুক্তিতে না আসে, তাহলে আরো জোরালো হবে আইডিএফের অভিযান।

এর আগে গত ৪ মে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজায় আগ্রাসন সম্প্রসারণের জন্য ‘চ্যারিওটস অফ গিডিয়ন’ নামক একটি অভিযানের অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে সরকার হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে এবং ১৮ মে থেকে সেনাবাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে স্থল হামলার মাধ্যমে তা কার্যকর করতে শুরু করে।

ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম কানের তথ্য মতে, এ অভিযান কয়েক মাস ধরে চলতে পারে এবং এর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ‘উত্তর গাজাসহ যুদ্ধকবলিত এলাকাগুলো থেকে গাজার সব বাসিন্দাকে দক্ষিণের এলাকাগুলোতে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেনাবাহিনী তাদের ‘দখলকৃত’ যেকোনো এলাকায় ‘থেকে যাবে’ বলেও জানানো হয়েছে।

এ দিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) শুক্রবার জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইসরাইলি তীব্র হামলা ও অবরোধের কারণে গাজায় এক লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বাসিন্দাদের ভাষ্য মতে, বাস্তুচ্যুতরাও ইসরাইলি গোলাবর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। স্থানান্তরের সময় এবং যেসব এলাকায় তারা আশ্রয় নিচ্ছে, সেখানেও তারা প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছে, যার ফলে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক আহ্বান উপেক্ষা করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার বিরুদ্ধে নৃশংস অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে নারী-শিশুসহ ৫৩ হাজার ৯০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত নভেম্বরে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) গাজায় সঙ্ঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ ছাড়াও ইসরাইল এ উপত্যকায় চলমান আগ্রাসনের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার মামলার সম্মুখীন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় নিহত ৭৯ জনের লাশ হাসপাতালে পৌঁছেছে। গতকাল রোববারও ব্যাপক হামলা হয়েছে উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে। সবশেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত গতকাল গাজায় ৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, যার মধ্যে রয়েছেন এক সাংবাদিকও। তবে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রতিরোধে আইডিএফের সেনা নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, শনিবার স্থানীয় সময় রাতে গুরুতর আহত হয়েছেন আইডিএফের এক সেনা। তিনি নাহাল ব্রিগেডের ৯৩১তম ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

অনাহারে ৪ বছরের শিশুর মৃত্যু

ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে অনাহারে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অবরুদ্ধ এ ভূখণ্ডে ইসরাইল দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ জারি রেখেছে এবং এর মধ্যেই খাদ্যের অভাবে আবারো শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটল। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সেখানকার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে গাজা শহরে ক্ষুধার কারণে মৃত চার বছরের ওই শিশুর নাম মোহাম্মদ ইয়াসিন। আলজাজিরাকে দেয়া এক বিবৃতিতে সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ইসরাইলের আরোপিত অবরোধের ফলে খাদ্য, পানি ও মানবিক সহায়তা গাজার বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছাতে না পারায় এ শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। মাহমুদ বাসাল আরো বলেন, এটা গাজায় ক্ষুধায় প্রথম শিশু মৃত্যুর ঘটনা নয়। খাদ্য ও পানি প্রবেশ করতে না পারলে, সামনে আরো অনেক শিশুর মৃত্যু আমরা দেখতে পাবো।”

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনাহারের কারণে মোহাম্মদ ইয়াসিনের মৃত্যু এই ধরনের ৫৮তম ঘটনা। অর্থাৎ ইসরাইলের অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় ক্ষুধার কারণে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগেই সতর্ক করেছিল, গাজা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। একাধিক প্রতিবেদন ও তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে উত্তর গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সহায়তা পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

চরম অপুষ্টিতে গাজার ৭১ হাজার শিশু ও ১৭ হাজার মা

গাজায় ইসরাইল সব ধরনের সাহায্য প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্রতর হয়েছে ক্ষুধা ও অপুষ্টি। ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে গাজার বাসিন্দারা। বর্তমানে উপত্যকাটির ৭১ হাজার শিশু এবং ১৭ হাজারেরও বেশি মা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। গত ১২ মে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন’ বা আইপিসি রিপোর্ট অনুসারে, গাজার ৪ লাখ ৭০ হাজার মানুষ বিপর্যয়কর ক্ষুধার সম্মুখীন। এ ছাড়া, পুরো জনগোষ্ঠী তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ৭১ হাজার শিশু এবং ১৭ হাজারেরও বেশি মা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন।তাদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। ২০২৫ সালের শুরুতে সংস্থাগুলো অনুমান করেছিল যে,৬০ হাজার শিশুর চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক সিন্ডি ম্যাককেইন বলেছেন, ‘গাজার পরিবারগুলো না খেয়ে আছে, অথচ তাদের প্রয়োজনীয় খাবার সীমান্তে পড়ে আছে। নতুন করে সঙ্ঘাত এবং মার্চের শুরুতে মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা তাদের কাছে খাবার পৌঁছাতে পারছি না।’

ইসরাইলের হামলায় চিকিৎসকের ১০ সন্তানের ৯ জন নিহত

গাজায় এক চিকিৎসকের বাড়িতে বর্বর হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইল। এতে ওই নারী চিকিৎসকের ১০ সন্তানের ৯ জনই নিহত হয়েছে। এ ছাড়া তার আরেক সন্তান ও স্বামী গুরুতর আহত হয়েছেন।

শুক্রবার গাজার খান ইউনুসে এই ভয়াবহ হামলা চালায় দখলদাররা। আলা আল-নাজার নামে এ চিকিৎসক নাসের হাসপাতালে কাজ করতেন। গ্রাহাম গ্রুম নামে এক ব্রিটিশ চিকিৎসক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, ওই নারী চিকিৎসকের ১১ বছর বয়সী আহত সন্তানের অস্ত্রোপচার করেছেন তিনি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে ওই নারী চিকিৎসকের ছোট ছোট সন্তানদের লাশ বের করে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেগুলো হামলার তীব্রতায় পুড়ে গেছে। শুক্রবার ইসরাইলি হামলায় গাজায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। যার মধ্যে এই ৯ জনও আছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ডাক্তার মুনির আলবোরস জানিয়েছেন, ওই নারী চিকিৎসককে তার স্বামী তার কর্মক্ষেত্রে গিয়ে দিয়ে আসেন। এরপর তিনি বাড়ি ফিরে যান। তিনি বাড়িতে ঢোকার কয়েক মিনিট পরই দখলদাররা ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়। ব্রিটিশ চিকিৎসক গ্রুম জানিয়েছেন, ওই নারীর স্বামীও চিকিৎসক ছিলেন এবং তিনি হামাস বা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও তিনি লেখালেখি করতেন না।